অসহায়দের ভাগ্য ফেরাচ্ছে ‘৮৪ ইভেন্ট’
মনিকা চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চার দশকেরও বেশি সময় আগে এসএসসি পাশ করেন তারা। এরপর জীবন তাদের নিয়ে গেছে ভিন্ন ভিন্ন পথে। কেউ পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে, কেউ চাকরি কিংবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালের সেই বন্ধুত্ব হারিয়ে যায়নি। নিজেদের জীবনে কিছুটা স্থিরতা আসার পর তাদের মনে হলো, শুধু নিজেদের জন্য এগিয়ে যাওয়াই নয়, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্যও কিছু করা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয় ‘৮৪ ইভেন্ট’-এর পথচলা।
শুরুতে হাত বাড়িয়েছিলেন মাত্র ৩২ জন। তিন বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা এখন ৫২। মির্জা শওকত, সাজ্জাদ পারভেজ, শাহাদাত হোসেন, ফারুক মোদীসহ কয়েকজন বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী, ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবীসহ নানা পেশার মানুষ।
প্রতি মাসে সদস্যরা এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে দেন। এর সঙ্গে যোগ হয় জাকাতের অর্থের একটি অংশ। এভাবেই গড়ে ওঠে তাদের মানবিক কর্মকাণ্ডের তহবিল। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন সহায়তায়। আছে অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার গল্প।
করোনাকালে কাজ হারিয়ে সংসার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ফাতেমা। এমন দিনও গেছে, যখন সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সেই সময়ে ফাতেমার পাশে দাঁড়ায় ‘৮৪ ইভেন্ট’। তার হাতে তুলে দেয় একটি গরু, সঙ্গে আরও কিছু সহায়তা। ফাতেমার জীবনে সেটিই হয়ে উঠেছিল নতুন করে শুরু করার অবলম্বন।
কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন মিজানও। কাজ না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ‘৮৪ ইভেন্ট’ তার হাতে তুলে দেয় রিকশা। সেই রিকশা নিয়েই আবার কাজে ফিরেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্বও এখন নিজের কাঁধেই নিতে পারছেন। বরিশালের বেলস পার্কে ফুল বিক্রি করে সংসারে সহায়তা করতে হতো ছোট্ট আমেনা ও মাইমুনাকে। ফুল বিক্রি করে যে বয়সে তাদের পরিবারের পাশে থাকার কথা ছিল না, সেই বয়সেই তারা জীবিকার তাগিদে পথে নেমেছিল। ‘৮৪ ইভেন্ট’-এর সহায়তায় ফুল বিক্রির পাশাপাশি আবার স্কুলে ফেরার সুযোগ পেয়েছে তারা। তাদের মতো আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে স্কুল ড্রেস ও শিক্ষাসামগ্রী তুলে দিয়েছে সংগঠনটি।
‘৮৪ ইভেন্ট’-এর কর্মকাণ্ড কোনো নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দেন সদস্যরা। তাই সহায়তার ধরনও বদলে যায় প্রয়োজন অনুযায়ী। কোথাও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার খরচ দেওয়া হচ্ছে; কোথাও সুপেয় পানির সংকট মেটাতে বসানো হচ্ছে গভীর নলকূপ। কোনো অসহায় নারীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সেলাই মেশিন; কোনো পরিবার পাচ্ছে উন্নত জাতের ছাগল বা হাঁস। কেউ ছোট দোকান শুরু করতে প্রয়োজনীয় মালামাল পাচ্ছেন। আবার কর্মহীন কারও হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে রিকশা। বন্ধুদের এই মানবিক উদ্যোগকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজের। তিনি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে নীরবে মানুষের জন্য কাজ করে আসছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের বিচ্ছিন্নভাবে করা উদ্যোগগুলোকে একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা করা হয়। সেই ভাবনা থেকেই ‘৮৪ ইভেন্ট’ ধীরে ধীরে একটি শক্ত কাঠামো পায়।
সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘আমরা মনে করি, মানুষ, সমাজ, পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সে জন্য আমরা এমন উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছি।’
‘৮৪ ইভেন্ট’-এর কাজের পরিধি এখন আর ৫২ জন বন্ধুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরিশালের ১০টি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে তাদের কার্যক্রম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা ১৯৮৪ সালের এসএসসি পাশ করা বন্ধুদেরও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ।
