বাগাটের দইয়ের স্বাদ মুখে লেগে থাকে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফরিদপুরের ঐতিহ্য বাগাটের দই। অসাধারণ স্বাদ, ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালি ও ঘনত্বের জন্য যার দেশজোড়া সুখ্যাতি রয়েছে। মূলত এর অনন্য স্বাদের কারণ-দই তৈরির প্রক্রিয়ায় ক্রিম বা সর না তোলা, নিখুঁত জ্বালপদ্ধতি এবং সব প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার। যে কারণে একবার খেলে এই দয়ের স্বাদ অনেকক্ষণ মুখে লেগে থাকে। যে কোনো অনুষ্ঠানে তাই পাতে এ দই না পড়লে যেন খাবারের আয়োজনই অসম্পূর্ণ থেকে যায়!
ফরিদপুর শহর থেকে ৩১ কিলোমিটার দূরে বাগাট ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের ঘোষপাড়ায় তৈরি দই স্থানীয়ভাবে ‘বাগাটের দই’ হিসাবে পরিচিত। দেড় শতাধিক বছর আগে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী এ দইয়ের সুনাম এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া বাগাটের ঘোষ পরিবারের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করে দই প্রস্তুত করে বিক্রি করছেন। তবে বাগাট বাজারের নিতাই চন্দ্র ঘোষের দোকানের দই ভোজনবিলাসীদের কাছে পছন্দের শীর্ষে।
স্থানীয়রা জানান, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, সুন্নতে খতনা বা যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে মাছ, মাংস, কুমড়া-পোলাও, কাচ্চি-বিরিয়ানি-যাই খাওয়া হোক না কেন, শেষে বাগাটের দই চাই-ই চাই। এ দই ছাড়া যেন আয়োজন পূর্ণতা পায় না!
বাগাটে ঘোষ সম্প্রদায় দেড়শ বছর আগে দই-মাঠা তৈরি শুরু করে। দেশবিভাগের পর দই প্রস্তুতকারী নিরাপদ ঘোষের হাত ধরে এ দইয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সেসময়ে করাচি, রাওয়ালপিন্ডিসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে যেত এই মিষ্টান্ন। বর্তমানে ওই পরিবারের কেউ এ ব্যবসায় নেই। অনন্য স্বাদের কারণ সম্পর্কে স্থানীয় জগদীশ ঘোষ জানান, এখানে দই বানানোর জন্য দুধ থেকে ক্রিম ওঠানো হয় না। যাতে প্রাকৃতিক স্বাদ থাকে। সুমিতা ঘোষ জানান, দই প্রস্তুতে দুধ কয়েকবার জ্বাল দিতে হয়। প্রথম দিন কয়েকবার জ্বাল দিয়ে রেখে দিতে হয়। পরের দিন আবার কয়েকবার জ্বাল দিয়ে তারপর দই পাতানো হয়।
সুনীল ঘোষের ভাগিনা প্রদীপ ঘোষ জানান, দুধ জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করতে হয়। এরপর পরিমাণমতো তাপমাত্রায় বীজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। কিছু সময় পর মাটির হাঁড়িতে ঢেলে আট ঘণ্টা ঢেকে রাখার পর প্রস্তুত করা হয় দই।
বাগাট বাজারের অন্যতম দই বিক্রি প্রতিষ্ঠান নিতাই ঘোষের ছেলে নিরঞ্জন ঘোষ বলেন, বংশপরম্পরায় দই-মিষ্টির ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দই ও মিষ্টি তৈরিতে আমাদের প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ মন দুধ লাগে। এ দুধ জ্বাল দিয়ে বেশির ভাগ দিয়েই দই তৈরি করা হয়। প্রতিকেজি দই বিক্রি হয় ১৫০ টাকা।
বাগাটের ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, ঘোষগ্রামের মানুষ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে এ দই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এ দইকে জনপ্রিয় করার পেছনে এই ইউনিয়নের একসময়ের চেয়ারম্যান সত্যচরণ ঘোষের বিশেষ ভূমিকা আছে। তার উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে এখানে পশু প্রজননকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এ কেন্দ্রের লক্ষ্য ছিল উন্নত মানের গাভি ও দুধ উৎপাদন। বর্তমানে এ এলাকায় অর্ধশতাধিক গরুর খামার আছে। এসব খামারের দুধ দই তৈরির মূল উপকরণ। দই ছাড়াও বাগাটে ছানার চমচম, মালাইকারি, চমচম, সর মালাই, দুধ মালাই, সাগরভোগ, জাফরান লাড্ডু, ছানার পোলাও, স্পঞ্জ রসগোল্লা, কাজু সন্দেশ, ছানার আমিত্তি, কালোজাম, শুকনা রসগোল্লা, বরফি সন্দেশ, বাদাম বরফি, কাঁচাগোল্লা, প্যারা সন্দেশ, রস চমচম, মালাই রোস্ট, দই, রসমালাইসহ ৩০ ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়।

