Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

গ্যাম্বলারচক্র সক্রিয়

পুঁজিবাজারে আইসিবির বিনিয়োগে সতর্কতা

Advertisement

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুঁজিবাজারে আইসিবির বিনিয়োগে সতর্কতা

Advertisement

পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস ঠেকাতে সরকারের কাছ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা পেয়েছিল ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। কিন্তু সেই টাকা হাতে পেয়েই হুট করে শেয়ারবাজারে ঢেলে দেয়নি রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠান। বাজারের অস্থিরতা, নিজের আর্থিক দুর্বলতা ও অতীতের লোকসান বিবেচনায় নিয়ে বাছাই করা ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ঋণের পুরো অর্থই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে আইসিবি। সম্প্রতি ওই অর্থ ব্যবহারের হিসাবের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের নিরীক্ষাও শেষ করা হয়েছে। আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বাক্ষর করা অর্থ বিভাগে সম্প্রতি পাঠানো এক চিঠিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

চিঠিতে বলা হয়, বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ে পুরো অর্থ বিনিয়োগ সম্ভব হয়নি। পরে বাড়তি সময় পাওয়ায় অবশিষ্ট অর্থও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি আইসিবি। সংস্থাটি শুধু শেয়ার কেনাবেচা করে না; প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি বাজারে বিনিয়োগ, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, মিউচুয়াল ও ইউনিট ফান্ড পরিচালনা, প্লেসমেন্ট ও ইক্যুইটি অংশগ্রহ, মার্জিন ঋণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। আইসিবির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ বাড়ানো তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

বিশেষ পরিস্থিতিতে আইসিবি বাজারে বড় ক্রেতা হিসাবে উপস্থিত হয়। এতে কোনো ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ কমে, তারল্য বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু এর বিপরীত ঝুঁকিও আছে। বাজার পড়ে গেলে আইসিবির পোর্টফোলিওর মূল্য কমে এবং বড় অঙ্কের কাগুজে লোকসান তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটিই হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি রেকর্ড প্রায় ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা নিট লোকসান করে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত আরও প্রায় ৫৮৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এতে সঞ্চিত লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। আইসিবির আর্থিক সংকট কাটাতে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে উচ্চ সুদের পুরোনো ঋণ পরিশোধ করা হয়। এতে সুদ ব্যয় প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা কমেছে। বাকি ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকা-দুই অর্থই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে আইসিবি। বিশেষ মনিটরিংয়ের আওতায় ওই বিনিয়োগ মূলত ‘এ’ ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজে করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের মেয়াদও ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আইসিবির যুক্তি, এখনই ঋণ পরিশোধ করতে গেলে বিপুল শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আইসিবির বর্তমান কৌশল অনেকটাই ঝুঁকি কমানো। দুর্বল মৌলভিত্তির, লোকসানি বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে না গিয়ে তুলনামূলক ভালো আর্থিক ভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে শুধু সাময়িক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, টেকসই সংস্কার প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কারসাজি ও অনিয়ম বাড়ে। একই সঙ্গে শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, আইসিবির ভূমিকা এখন ‘যে কোনো শেয়ার কিনে বাজার ঠেকানো’ নয়; বরং ঝুঁকি বুঝে নির্বাচিত শেয়ারে বিনিয়োগ করে বাজারে আস্থা ও তারল্য ধরে রাখা।

সক্রিয় কারসাজিচক্র : এর মধ্যেই পুঁজিবাজারে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন কারসাজিচক্র। সাম্প্রতিক তদন্তে কমসংখ্যক শেয়ারের কোম্পানিতে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দর বাড়ানোর ঘটনাও ধরা পড়েছে। একটি ঘটনায় একটি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লেনদেনযোগ্য শেয়ারের বড় অংশ কিনে কৃত্রিম চাহিদা তৈরির চেষ্টা করেছিল বলে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন- বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-ডিএসইর তদন্তে উঠে আসে। এছাড়া কোনো কোনো শেয়ারের দাম ও লেনদেনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে বা কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে একটি চক্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাজারে টেনে আনার চেষ্টা করছে-এমন অভিযোগও রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ‘গ্যাম্বলার’চক্র সক্রিয় থাকলে সরকারি অর্থের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী যখন মৌলভিত্তি বিবেচনায় বিনিয়োগ করবে, তখনো কারসাজির মাধ্যমে কোনো দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হলে সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। এছাড়া আইসিবির মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাজারে নামলে একদিকে তারল্য বাড়ে, অন্যদিকে কারসাজিকারীরা সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। এ কারণেই আইসিবিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, পুঁজিবাজারের সংকট শুধু তারল্যের নয়, কাঠামোগতও। তিনি বলেন, নিুমানের আইপিও, আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, বিও হিসাবের অস্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে কারসাজি-এসব বড় সমস্যা। দুর্বল নজরদারি ও অপরাধীদের শাস্তির আওতায় না আনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বাজার এখনো নাজুক : আগস্টে ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে নেমেছিল। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বাজার এখনো অস্থির। ৩ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা; সপ্তাহ শেষে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬৬২ পয়েন্টে। তাই ১ হাজার কোটি টাকা বা আইসিবির নিজস্ব আরও কিছু বিনিয়োগ-কোনোটিই এককভাবে বাজারের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বরং ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি, কারসাজি বন্ধ, আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই এখন বড় কাজ।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম