কুমিল্লা সীমান্তে বেপরোয়া অর্ধশত হুন্ডি সিন্ডিকেট
প্রতিদিন ভারতে পাচার হচ্ছে কয়েকশ কোটি টাকা * হুন্ডিচক্রের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মাদক ও চোরাই পণ্য
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা সীমান্তে বেপরোয়া অর্ধশতাধিক হুন্ডি সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার হচ্ছে কয়েকশ কোটি টাকা। জেলার ৫ উপজেলার সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন এসব হুন্ডি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ভারত থেকে মাদক ও চোরাই পণ্য আনার ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসাবে কাজ করছে এসব সিন্ডিকেট। মাদক ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারিরা পণ্যের মূল্য নগদ টাকায় পরিশোধ করছেন হুন্ডির মাধ্যমে। এতে অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব হুন্ডি নেটওয়ার্ক শুধু সনাতন পদ্ধতিতেই নয়, নানা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল মাধ্যমেও টাকা পাচার করছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এ চক্রের কিছু সদস্য আটক হলেও অধরা সিন্ডিকেটপ্রধান এবং রাঘববোয়ালরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘিরে সক্রিয় অর্ধশতাধিক হুন্ডি সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জেলার সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন শতশত কোটি টাকার মাদক চোরাচালান আসছে। জেলার চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সীমান্ত এলাকায় মাদক ব্যবসা এবং স্বর্ণ ও পণ্য চোরাচালানের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে হুন্ডি কারবারিরা মাধ্যম হিসাবে কাজ করছেন। ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে সরাসরি দুই দেশের এজেন্টদের মাধ্যমে এই টাকা আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
অবৈধপথে মানব পাচার এবং রাজনৈতিক অর্থের লেনদেনেও এই হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি সীমান্তে একাধিক অভিযান চালিয়ে বিজিবি-পুলিশ নগদ টাকা ও হুন্ডির ক্যাশ মেমো জব্দ করেছে।
সূত্র জানায়, এসব হুন্ডিচক্র মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অপব্যবহার করে। স্থানীয় কিছু অসাধু এজেন্ট অ্যাকাউন্টকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ‘ডিজিটাল হুন্ডি’ কারবার করছে। সম্প্রতি আদর্শ সদর উপজেলার বিষ্ণপুর সীমান্তে ভারতে টাকা পাচারকালে ফোরকান উদ্দিন (৩৫) নামে এক হুন্ডি ব্যবসায়ীকে আটক করেছে বিজিবি। এ সময় তার কাছ থেকে হুন্ডির ২৮ লাখ টাকা এবং ৩০ হাজার টাকা দামের ২টি মোবাইল ফোন সেট জব্দ করা হয়। সীমান্তের আদর্শ সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুরে রাসেল সিন্ডিকেটের এক নারী সদস্য ২০ লাখ টাকাসহ বিজিবির হাতে ধরা পড়েছেন। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় ডিবি পুলিশ এবং বিজিবির একাধিক অভিযানে হুন্ডিচক্রের বেশ কয়েকজন সদস্য আটক হয়েছে। তবে অধিকাংশ সিন্ডিকেট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিরাপদে কারবার চালাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানায়, বুড়িচং উপজেলার পীর যাত্রাপুর ইউনিয়নের কণ্ঠনগর গ্রামের আইয়ুব আলী সিন্ডিকেট দীর্ঘ ২০ বছর মুদ্রা পাচারের কাজ করে যাচ্ছে। আইয়ুব আলীর সহযোগী হিসাবে কাজ করছেন একই এলাকার নুরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন।
বুড়িচং বাজারে মুদি ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি কারবার চালিয়ে যাচ্ছে ভাগিনা মনির সিন্ডিকেট। তার অধীনে বেশকিছু সদস্য রয়েছেন। তাছাড়া উপজেলার খারেরা এলাকার রফিজ মেম্বার সিন্ডিকেট, একই এলাকার হানু মিয়া সিন্ডিকেট, গাজী সিন্ডিকেট হুন্ডি কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
সীমান্তের ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগরা বাজারে হুন্ডি কারবার করছে কবির খাঁন সিন্ডিকেট, শশীদল বাজারের ইউসুফ সিন্ডিকেট, একই এলাকার আনোয়ার, উজ্জ্বল সিন্ডিকেট হুন্ডি কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ী এলাকার মনির সিন্ডিকেট, জাকির সিন্ডিকেট, শেকুল সিন্ডিকেট, নিশ্চিতপুরের রাসেল সিন্ডিকেট এবং জাভেদ সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা ভারতে পাচার করছে। এছাড়া রয়েছে সদর দক্ষিণের বলেরডেপার হানিফ সিন্ডিকেট, দলকিয়ার মফিজ সিন্ডিকেট, মথুরাপুর এলাকার মিজান সিন্ডিকেট, কমলপুরের সাইফুল সিন্ডিকেট, রাজেশপুরের রুবেল-কালা সিন্ডিকেট।
চৌদ্দগ্রামের চরলক্ষ্মীপুর এলাকার পেয়ার আহমেদ সিন্ডিকেট, চিওড়া এলাকার লিটন সিন্ডিকেট, ঘোলপাশার সুজন সিন্ডিকেট মাদক ব্যবসার পাশাপাশি হুন্ডি কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি-প্রতিটি সিন্ডিকেটের অধীনে ২০ থেকে ৩০ জন ক্যারিয়ার টাকা লেনদেনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ এবং পাচারের কাজে ক্যারিম্যানরা কাজ করছেন।
কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, আমরা মাদক ও চোরাকারবারিদের পাশাপাশি হুন্ডি কারবারে জড়িতদের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করছি। তবে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা অভিনব কৌশল অবলম্বন করায় তাদের হাতেনাতে ধরা অনেক কঠিন।
কুমিল্লা ১০ বিজিবির ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, সম্প্রতি মুদ্রা পাচারে জড়িত বেশ কয়েকজন হুন্ডি ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তে এসব চক্রকে আটকে আমাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

