Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন

সভাপতিই ‘গিলে খাচ্ছে’ খুলনার তেলের বড় অংশ

Advertisement

Icon

আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সভাপতিই ‘গিলে খাচ্ছে’ খুলনার তেলের বড় অংশ

Advertisement

প্রভাব খাটিয়ে খুলনার জন্য বরাদ্দ তেলের বড় একটি অংশ একাই গিলে খাচ্ছেন বাংলাদেশ ট্যাংক লরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন খুলনা বিভাগীয় শাখার সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল। অনেক পাম্প মালিককে বঞ্চিত করে দিনে উত্তোলন করছেন বরাদ্দের কয়েকগুণ তেল। পরে ওই তেল বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চাহিদামতো তেল না দিলে ডিপো ম্যানেজারকেও হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। নানা ছুতোয় ধর্মঘট ডাকার হুমকি তো আছেই। এই কাবুলকে ঘিরে খুলনায় একটা দুষ্ট তেল চক্র গড়ে উঠেছে।

এই অঞ্চলের পুরো জ্বালানি সেক্টর এদের হাতে জিম্মি। এর প্রভাব পড়ছে এলাকার অর্থনীতির ওপর। অনিয়মের মাধ্যমে উপার্জন করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি এসএম কামাল হোসেনের আস্থাভাজন এই ব্যবসায়ীকে বর্তমান সরকারের লোকজনও সরাতে পারেনি। কোনো-না-কোনোভাবে ম্যানেজ করে সম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন।

জানা যায়, অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাবুল তেল উত্তোলন করেন সাধারণত যমুনা ডিপো থেকে। সেই ডিপোর চার্ট হিসাব করে দেখা গেছে ডিলারদের জন্য নির্ধারিত তেল বরাদ্দের বড় অংশ উত্তোলন করছেন তার নির্ধারিত পাম্পগুলোর জন্য। সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী আগের বছর যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হয়েছিল, সেই হারে তেল বরাদ্দ নেবেন। অথচ কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন পাম্পগুলো ওই নিয়মকে তোয়াক্কা করছে না।

কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন ৮টি পাম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মেসার্স আইয়ুব হোসেন অ্যান্ড কোং স্টেশন ১৯ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল উত্তোলন করলেও চলতি বছর উত্তোলন করেছে ১ লাখ ৬৭ হাজার লিটার, আগের বছর ডিজেল নিয়েছে ৬১ হাজার ৫০০ লিটার, চলতি বছর নিয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার লিটার। মেসার্স করিম ফিলিং স্টেশন ২০২৫ সালে অকটেন নিয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ লিটার, পেট্রোল ২০ হাজার ৫০০ ও ডিজেল ৪৫ হাজার লিটার। চলতি বছরে অকটেন নিয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার লিটার, পেট্রোল ৮৬ হাজার লিটার এবং ডিজেল ৪ লাখ ১৯ হাজার লিটার। রজনীগন্ধা ফিলিং স্টেশন ২০২৫ সালে অকটেন নিয়েছে ৪৬ হাজার লিটার, পেট্রোল ৬৮ হাজার ৫০০ লিটার এবং ডিজেল ১ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ লিটার। বিপরীতে চলতি বছরে অকটেন নিয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার লিটার, পেট্রোল ১ লাখ ২০ হাজার লিটার এবং ডিজেল ৪ লাখ ৩৮ হাজার লিটার। মেসার্স যশোর ফিলিং স্টেশন গত বছর অকটেন নিয়েছে ৭৩ হাজার লিটার, পেট্রোল ১ লাখ ২৮ হাজার এবং ডিজেল ৫ লাখ ১১ হাজার লিটার।

চলতি বছর নিয়েছে অকটেন ৮৫ হাজার লিটার, পেট্রোল ১ লাখ ৩৩ হাজার এবং ডিজেল প্রায় ৭ লাখ লিটার। একইভাবে সুলতানা ফিলিং স্টেশন গত বছরের তুলনায় পেট্রোল বেশি নিয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার লিটার এবং ডিজেল বেশি নিয়েছে ৪০ হাজার লিটার। অন্যদিকে কেশবপুর ফিলিং স্টেশন এ বছর অকটেন বেশি নিয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার লিটার, পেট্রোল ১৪ লাখ ২৫ হাজার লিটার এবং ডিজেল সাড়ে ৪ লাখ লিটার। দেশ ফিলিং স্টেশন পেট্রোল প্রায় ১ লাখ লিটার এবং ডিজেল বেশি নিয়েছে দেড় লাখ লিটার। কাশিয়ানি ফিলিং স্টেশন পেট্রোল ৬০ হাজার লিটার এবং ডিজেল বেশি নিয়েছে ১ লাখ লিটার।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এই বিপুল পরিমাণ তেল তুলে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ব্যারেলে এই তেল চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর খুচরা বিক্রেতারা এই তেল নিচ্ছে। গ্রামের কৃষক অথবা প্রান্তিক গ্রাহকরা উচ্চদামে সেই তেল কিনে ব্যবহার করছে। অথচ এ অঞ্চলের অনেক পাম্প মালিক আছে যারা সংকটকালীন তেল তুলতে পারছেন না। শহরের অভ্যন্তরে এলেনা পাম্প, আল আরাফা পাম্প, ভিআইপি ফিলিংসহ অন্তত ৭০টি স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। স্থানীয় ডিলারদেরও তেলও খেয়ে ফেলছেন সমিতির নেতারা।

যমুনা ডিপোর প্যাক পয়েন্ট ডিলার (পিপিডি) ও বাংলাদেশ ফুয়েলের স্বত্বাধিকারী জুয়েল ও দিঘলিয়ার কালাম জানান, সারা দেশের ডিলাররা তেল পাচ্ছেন, শুধু খুলনায় ডিলারদের তেল দিচ্ছে না। পেট্রোল পাম্প মালিকসহ সমিতির নেতারা ইচ্ছামতো তেল উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছেন। পাম্প থেকে ব্যারেলের মাধ্যমে আমার ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

বেশি তেল নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল বলেন, নিয়ম মেনে যেমন তেল নেওয়া হয়েছে, তেমনই বিপণন হয়েছে। এজেন্সির তেলও আমরা নিয়েছি। তৃণমূলের লোকদেরও তেল দিতে হয়েছে। আমাকে তেল দিলেও খুশি, না দিলেও খুশি। আমি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করিনি। টাকা দিয়ে তেল নিয়েছি, ফ্রি নিইনি। কেউ পায়নি, এমন অভিযোগ নেই।

যমুনা অয়েল কোম্পানির সেলস অফিসার মোস্তাক আহমেদ বলেন, অ্যাসোসিয়েশন থেকে সভাপতি নির্দিষ্ট কিছু পাম্পের জন্য চাহিদা পাঠান। সেই আলোকে তেল না দিলে নানা ধরনের হুমকি আসে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো কারণ ছাড়াই ধর্মঘট পালনের মতো কর্মসূচি দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন। ডিপোসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনেকটা জিম্মি ব্যবসায়িক সংগঠন ও জ্বালানি শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের কাছে।

কমিটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক : ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ-সদস্য এসএম কামাল হোসেন তার আশীর্বাদপুষ্টদের দিয়ে সংগঠনটির খুলনা বিভাগীয় পকেট কমিটি গঠন করে দেন। সভাপতি হন সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক হন সুলতান মাহমুদ পিন্টু। পিন্টুর বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে। কোনো নির্বাচন ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমান কমিটির তালিকার নিচে কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো অনুমোদন বা স্বাক্ষরও নেই।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম