মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কঠোর বার্তা
দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি বলেছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়াতে হবে সরকারি কাজের গতি। নিজের কর্মস্থলকেও গতিময় করতে হবে। মঙ্গলবার বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বর্তমান সরকারের শাসনামলে অনুষ্ঠিত প্রথম সচিব সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় উপস্থিত একাধিক সচিব যুগান্তরকে বিষয়গুলো নিশ্চিত করেন।
তিনি সচিবদের উদ্দেশে বলেন, দেশে জ্বালানি ও গ্যাসের সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে ই-নথি চালু করতে হবে, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা যায়। সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে আসা ও যাওয়ার হাজিরা সঠিকভাবে তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতঃপূর্বে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে যেসব বিষয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সচিব জানান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, সরকার শূন্য পদে জনবল নিয়োগ দেবে। আইন ও বিধি মেনে শূন্য পদে জনবল নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চাপ, টেলিফোন, তদবির ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক পদ্ধতিতে নিয়োগ চূড়ান্ত করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেউ তদবির করলে তা নির্ধারিত নিয়মে সরকারকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
দেশের প্রতিটি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ঘুস নিচ্ছেন। যেখানে সেবা পাওয়ার কথা, সেখানেই আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। ঘুস ছাড়া ফাইল নড়ে না। চলতি সপ্তাহে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী চোর। অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা বলেছেন, দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরা চোর। এসব উদাহরণ টেনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টের কোনো মূল্য নেই। কেউ আমাদের সম্মান করে না। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যারা দুর্নীতি করবে, তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনোভাবেই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। সভায় উপস্থিত অপর একজন সচিব জানান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, সরকারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী সকাল ৯টায় অফিসে আসেন না। এটা সচিবালয়ের চিত্র। মফস্বল পর্যায়ে অফিসের চিত্র আরও ভয়াবহ। অনেককে ১০টার পরও অফিসে আসতে দেখা যায়।
আবার বিকালে অনেকেই সাড়ে ৩টার মধ্যে অফিস ত্যাগ করেন। এসব আর মেনে নেওয়া হবে না। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত এবং প্রস্থান করতে হবে। কোনো ধরনের অজুহাত-আবদার গ্রহণ করা হবে না। অফিসে উপস্থিতি এবং প্রস্থান মনিটরিং করতে সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারের সামনে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট। অতীতের সরকার আর্থিক খাত ধ্বংস করে দিয়েছে। আর্থিক বুনিয়াদ বা ভিত্তি দুর্বল করে রেখে গেছে। ফলে সরকারকে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় মেধা খাটাতে হচ্ছে। দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ যুদ্ধের আওতায় অবস্থান করছে। এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য দ্রব্য সহজে পাওয়ার প্রায় সব রাস্তা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। জ্বালানির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হতো। বর্তমানে সার আমদানির বিকল্প সোর্স খোঁজা হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি বিকল্প হিসাবে সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। আগামী ৫ বছরে সরকার বিকল্প জ্বালানি হিসাবে সোলার প্যানেল থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার টার্গেট নির্ধারণ করেছে। সেক্ষেত্রে সব সরকারি স্থাপনায় সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, সচিবালয় থেকে নিয়ে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অফিসে সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশ সোলার প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুতের চাহিদা অনেকাংশে লাঘব করেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত থাকা সত্ত্বেও গত প্রায় এক মাস মাঠ পর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। সরকার কঠোরভাবে তা মোকাবিলা করেছে। এ ধরনের অনেক চ্যালেঞ্জই আসবে। সরকারি দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে হবে। কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনে ই-নথি চালু করতে হবে। কোনো ফাইল সিদ্ধান্ত ছাড়া ফেলে রাখা যাবে না। কোনো ফাইল নিষ্পত্তি করতে না পারলে কারণ উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দপ্তরে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য পাঠাতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কঠোর। কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে সেবা যথাসময়ে নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ সেবা নিয়ে যেন কোনো ধরনের অভিযোগ তুলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এমন বিষয়ে আগে থেকেই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

