Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

একই কর্মস্থলে অর্ধযুগ ডা. বার্নাবাস

লুটপাটের ‘স্বর্গরাজ্য’ তানোর স্বাস্থ্যকেন্দ্র

মান ও পরিমাণমতো রোগীদের খাবার না দেওয়া, ওষুধ বাইরে বিক্রি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠিয়ে কমিশন গ্রহণসহ ব্যাপক দুর্নীতি

Advertisement

তানজিমুল হক

তানজিমুল হক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লুটপাটের ‘স্বর্গরাজ্য’ তানোর স্বাস্থ্যকেন্দ্র

Advertisement

রাজশাহীর তানোর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বার্নাবাস হাসদাক অর্ধযুগ ধরে একই কর্মস্থলে রয়েছেন। পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে ওষুধ কেনাকাটায় করেছেন নয়ছয়। আর আওয়ামী লীগ নেতার লাইসেন্স ব্যবহার করে রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। আউটসোর্সিংয়ে নিজের লোক নিয়োগ, সরকারি ওষুধ কালোবাজারি, বেসরকারি ডায়াগনস্টিকের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণ, মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্য, অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি তেলের অর্থ আত্মসাৎসহ এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে ডজনখানেক খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। নিজস্ব বলয় তৈরি করে তিনি লোপাট করেছেন সরকারি অর্থ।

যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে ডা. বার্নাবাস হাসদাকের বিরুদ্ধে লুটপাট, অর্থ আত্মসাৎ, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত ২২ জুন তানোর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন এবং উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক মন্ডল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম এক চিঠিতে রাজশাহীর সিভিল সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দিলেও ইতোমধ্যে ১৮ কর্মদিবস অতিবাহিত হয়েছে। নেই তদন্তের অগ্রগতি। অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কমিটির প্রধান সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কৌশল নিয়ে ডা. বার্নাবাসকে ‘রক্ষা’ করার চেষ্টা করছেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য এবং লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৯ মে ডা. বার্নাবাস তানোরে যোগদান করেন। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন। দায়িত্বে থেকে ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জামাদি কেনার জন্য তার নেতৃত্বে ছয়টি টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত তিন অর্থবছরে ইজিপি টেন্ডারে ঠিকাদার বাবুলের ‘তানভির এন্টারপ্রাইজ’ এবং শফিকুলের ‘শফিকুল হক এন্টারপ্রাইজ’ লাইসেন্সের মাধ্যমে ডা. বার্নাবাস ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জামাদি সরবরাহ নিয়েছেন। প্রত্যেক অর্থবছরে কোটি টাকার টেন্ডারে ছয় থেকে সাতজন করে ঠিকাদার অংশ নিলেও বাবুল এবং শফিকুল ছাড়া কেউ কাজ পাননি। ডা. বার্নাবাস বিধিবিধান লঙ্ঘন করে ইজিপির গোপন রেট এই দুই ঠিকাদারকে জানিয়ে দিয়ে কাজ পেতে সহযোগিতা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

জাজ এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার রোকন উদ্দিন বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল। তারপরও কাজ দেওয়া হয়নি। শফিকুল ও বাবুলকে দেওয়া হয়েছে। ইজিপির গোপন রেট জানিয়ে দিয়ে ডা. বার্নাবাস তার পছন্দের দুই ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছেন।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের নির্ধারিত মান ও পরিমাণে খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভয়াবহ দুর্নীতি। গত দুই অর্থবছর থেকে ডা. বার্নাবাস তানোর পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আতাউর রহমান সরকার ওরফে তারেক সরকারের ‘মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজ’ লাইসেন্সের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন। রোগীপ্রতি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। কিন্তু রোগীদের যথাযথ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ না করে ডা. বার্নাবাস প্রতিবছর আত্মসাৎ করছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা তারেক নিম্নমানের খাবার সরবরাহের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি তেল খরচের ব্যাপারেও রয়েছে দুর্র্নীতি। অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতিবছর বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয় করা হয়েছে দুই লাখ। অ্যাম্বুলেন্সের সাবেক চালক আব্দুস সালামের সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্স মেরামত না করেই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে অর্থ। বিষয়টি প্রকাশ হলে অডিট আপত্তি ওঠে। অডিট টিম ঘটনার সত্যতা পেলে চালক সালামকে গত বছরের অক্টোবরে তানোর থেকে বদলি করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু বহাল তবিয়তে রয়ে যান ডা. বার্নাবাস।

ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে দরিদ্র রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ যথাযথভাবে বিতরণ না করার অভিযোগ রয়েছে। ওষুধের একটি বড় অংশ তিনি তার লুটপাট সিন্ডিকেটের সদস্য মাহাবুব ও সুমন নামের দুই ব্যক্তির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁর মান্দা, নিয়ামতপুর ও মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করেন। এছাড়া হাসপাতালেই রোগীদের বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মাত্র একশ গজ দূরে সেফা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন কমিশন বাণিজ্য।

ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। তাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন মাহাবুব, সুমন, আগাদা, শেফা ও ববি নামের কয়েকজন ব্যক্তি। এরা হাসপাতালের কর্মচারী না হলেও এদের মাধ্যমে ডা. বার্নাবাস তৈরি করেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

তানোরের তালন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, আমার এক নিকটাত্মীয় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি ছিলেন। মামলা করার কারণে মেডিকেল সার্টিফিকেটের প্রয়োজন ছিল। ডা. বার্নাবাস ১০ হাজার টাকা উৎকোচ নিয়ে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে আড়াই বিঘা আয়তনের পুকুর প্রায় ছয় বছর ধরে লিজ না দিয়ে নিজেই মাছ চাষ করে পুকুরের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ২০২১ সাল থেকে সরকারি কোয়ার্টারে বাস করলেও বেতনের টাকা থেকে তিনি বাসাভাড়া কর্তন করেন না। অভিযোগকারী তানোর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক মন্ডল বলেন, ‘ডা. বার্নাবাসের দুর্নীতির কারণে দরিদ্র সেবাপ্রার্থীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তদন্ত কমিটির প্রধান রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সরেজমিন তদন্তের জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর তানোর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকালে যাওয়ার জন্য আমাদের চিঠি ইস্যু করেন। কিন্তু তিনি আসেননি। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. বার্নাবাসকে রক্ষার চেষ্টা করছেন।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. বার্নাবাস হাসদাক বলেন, ‘গোপন রেটের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। টেন্ডার কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ, পুকুর লিজ না দেওয়া, কমিশন ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যসহ যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ে কথা বলব না। তথ্য চাইলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করে তথ্য নিতে হবে।’

জানতে চাইলে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, সরেজমিন তদন্তের জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর যাওয়ার কথা থাকলেও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় যেতে পারিনি। তদন্ত কাজে সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করবেন বলে জানান তিনি। ডা. বার্নাবাস হাসদাককে ‘রক্ষার’ অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, এটা কেউ বলতে পারে, কিন্তু আমরা যথাযথ তদন্ত করব।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম