‘ডেথ জোন’ কুমিল্লার লালমাই পাহাড়
Advertisement
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাচীন ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুমিল্লার লালমাই পাহাড় এখন ‘ডেথ জোনে’ পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল নজরদারির সুযোগে নির্জন এই পাহাড়কে খুন, ধর্ষণ ও মাদক চোরাচালানের নিরাপদ জায়গা হিসাবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। সম্প্রতি একাধিক শিশু-কিশোরের লাশ উদ্ধার, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ এবং সবশেষ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যার পর পাহাড়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। চোখের সামনে এসব জঘন্য অপরাধ ঘটতে দেখলেও প্রাণভয়ে মুখ খুলছেন না পাহাড়ের বাসিন্দারা।
একসময় পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে লালমাই পাহাড় ছিল বিনোদন ও স্বস্তির নিরাপদ জায়গা। কিন্তু ভৌগোলিক নির্জনতা ও সীমান্ত এলাকার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা এটিকে বানিয়েছে অপহরণ, খুন, ধর্ষণ ও মাদক চোরাচালানের অভয়ারণ্য। অনেক সময় কুমিল্লা নগরীসহ আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে এই পাহাড়ে নিয়ে আসে অপরাধীরা। এছাড়া চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে পাহাড়ে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে লালমাই পাহাড়ের হাতিগাড়া থেকে মেহেদী হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পাহাড়ের চণ্ডীমুড়া থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়। চলতি বছরের ২৯ আগস্ট পাহাড়ের শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়। সবশেষ এই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় নির্মমভাবে খুন হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।
সীমান্ত এলাকা ও প্রধান মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের দুর্গম পয়েন্টগুলো নিরাপদ ট্রানজিট হিসাবে বেছে নিয়েছে মাদককারবারিরা। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গোপন আস্তানা গড়ে গাঁজা ও ইয়াবাসহ মাদকের বিশাল চালান মজুত ও কেনাবেচা চলছে। বিভিন্ন সময়ে র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদকসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও কারবারিদের গ্রেফতার হলেও মূল নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
পাহাড়ের বাসিন্দারা জানান, চোখের সামনে প্রতিদিন নানা অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রাণের ভয়ে তারা নীরব থাকেন। পাহাড়ের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, এমন কোনো অপরাধ নেই, যা এখানে সংঘটিত হয় না। আমরা পাহাড়ে বসবাসকারীরাও সবসময় চরম আতঙ্কে থাকি।
চণ্ডীমুড়া এলাকার হুমায়ূন কবির বলেন, হরহামেশাই এখানে খুন ও ধর্ষণ হচ্ছে। এখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য তেমন আসে না।
স্থানীয়দের দাবি, লালমাই পাহাড়ের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কেবল সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন যৌথ অভিযানই যথেষ্ট নয়। পাহাড়ে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, সার্বক্ষণিক নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং গ্যাংগুলোর গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীসহ লালমাই পাহাড়ের সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনব। পাহাড়ে আমরা প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করছি। সেখানে লুকিয়ে থাকা কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
