পাহাড়তলী কলেজে চার মাস বেতন বন্ধ
মানবেতর জীবনযাপন শিক্ষক-কর্মচারীদের
মাউশির তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় অচলাবস্থা
Advertisement
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কলেজে চার মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের ‘ফান্ড’ থেকে বেতন-ভাতা না দেওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির নন-এমপিও এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারীরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে কয়েক মাস ধরে বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন। টাকার অভাবে কেউ ভুগছেন বিনা চিকিৎসায়। এসব কিছুর জন্য তারা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) চট্টগ্রাম পরিচালককে দুষছেন।
বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি নূর মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, পাহাড়তলী কলেজের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মাউশি চট্টগ্রাম কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে। তদন্ত চলমান থাকায় শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার মাউশি চট্টগ্রাম পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেটি এখনো দেওয়া হচ্ছে না। সূত্র জানায়, বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পাহাড়তলী কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক আতাউল হক ভূঁঞা প্রতিষ্ঠানের ১০টি অনিয়ম-দুর্নীতি উল্লেখ করে মাউশিতে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়-কলেজটিতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম, অর্থ তছরুপ ও স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধা প্রদানে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতি বিদ্যমান। নিয়োগ, দায়িত্ব-বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চল। এরই মধ্যে কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ছাড়া অন্য ভাতা স্থগিত করেন প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি। সেই সিদ্ধান্ত না মেনে বেতন-বিল প্রস্তুত বন্ধ করে দেন কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার। এ কারণে চলতি মাসসহ গত পাঁচ মাস কলেজ ফান্ড থেকে বেতন-ভাতা দেওয়া বন্ধ রয়েছে।
পাহাড়তলী কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক পম্পা বড়ুয়া বলেন, ‘বেতন না পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। তিন মাস ধরে ঘর ভাড়াও দিতে পারছি না। এরই মধ্যে বাড়ির মালিক বাসা ছেড়ে দিতে বলেছেন।’
বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘কলেজের অনিয়ম-দুর্র্নীতি নিয়ে কথা বলায় গত মাসে আমাকে কলেজ থেকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল। সন্ত্রাসীরা আমার হাতের আঙুল ভেঙে দিয়েছে। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছি না।’ গত ২৯ আগস্ট যুগান্তরে ‘অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা : পাহাড়তলী কলেজ গিলে খাচ্ছেন অধ্যক্ষ!’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর ওইদিন বিকালেই প্রভাষক মিজানুর রহমানকে কলেজ থেকে তুলে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন বগার বাহিনী। কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের নির্দেশে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই শিক্ষকের রুম তছনছ করা হয় এবং ১২ হাজার টাকা নিয়ে যায় তারা। এরপর খুলশী থানাধীন ওয়্যারলেস ২নং লেইনে টর্চার সেলে আটকে রেখে মারধর ও নির্যাতন করেন বগা ও তার লোকজন। এ ঘটনায় অধ্যক্ষকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাতসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক মিজানুর রহমান। সূত্র আরও জানায়, পাহাড়তলী কলেজে এমপিওভুক্ত, নন-এমপিও এবং খণ্ডকালীনসহ ৫০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ২৫ জন, কর্মচারী ১০ জন, নন-এমপিও শিক্ষক ৭ জন, খণ্ডকালীন শিক্ষক ৫ জন ও কর্মচারী ৩ জন রয়েছেন। এদের মধ্যে এমপিওভুক্তরা সরকারি বেতন পেলেও নন-এমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো বেতন পাচ্ছেন না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক এমএম সহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আগের পরিচালক থাকতে তদন্ত কমিটির কাজ শুরু হয়েছিল। আমি যোগ দেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলেছি। আগামী রোববার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
