বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস আজ
সামগ্রীর সংকটে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ
টিএফআর বেড়ে ২.৪, দ্রুত উদ্যোগের তাগিদ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে বাল্যবিয়ের হার কিছুটা কমলেও কিশোরী বয়সে সন্তান ধারণের চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট এবং সেবার সীমিত সুযোগ যুক্ত হওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমছে না। দারিদ্র্য, কম শিক্ষার হার, প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি ও সামাজিক সংকোচ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস-২০২৬’।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘নো ব্যারিয়ার্স, জাস্ট চয়েসেস : কনট্রাসেপটিভ অ্যাকসেস নাউ’-‘কোনো বাধা নয়, শুধুই পছন্দ’। গর্ভনিরোধক সম্পর্কে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সেবা সহজলভ্য করা, ব্যক্তি ও দম্পতিকে সন্তান নেওয়ার সময় ও ব্যবধান সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই দিবসের মূল লক্ষ্য।
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মালটিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্যানুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ২০১৯ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৪ ও ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ কিছুটা অগ্রগতি হলেও বাল্যবিয়ে এখনো ব্যাপক।
শিক্ষা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে বাল্যবিয়ের সম্পর্কও স্পষ্ট। এমআইসিএসের হিসাবে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই-এমন নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৬৯ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে এ হার ৬৫ শতাংশ। বিপরীতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন নারীদের মধ্যে এ হার ২৮ শতাংশ। গ্রাম ও শহরের মধ্যেও ব্যবধান রয়েছে-গ্রামীণ নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৫৮ শতাংশ, শহরে ৫০ শতাংশ।
বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কিশোরীদের অল্প বয়সে সন্তান ধারণের চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমআইসিএস ২০২৫-এ ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরীদের সন্তান জন্মের হার প্রতি হাজারে ৯২ জনে উন্নীত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা ২০১৯ সালের ৮৩ জনের তুলনায় বেশি। অল্প বয়সে গর্ভধারণে মা ও নবজাতকের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি অপরিণত সন্তান জন্ম, মৃত সন্তান প্রসব এবং প্রসবকালীন জটিলতার আশঙ্কাও বাড়ে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. জিন্নাত রেহানা যুগান্তরকে বলেন, দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) কমানোর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে টিএফআর ২ দশমিক ১৫-এ নেমে এসেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের হিসাবে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগের। একবার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে এলে তা আবার হঠাৎ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় নয়। তাই এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দুবছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) কিছু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সহজলভ্য করা সম্ভব হয়নি। এটি বর্তমানে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। টিএফআর বৃদ্ধি এখন জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচার, প্রচারণা ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা সেবার তথ্য এবং উপকরণ দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
মেরী স্টোপস বাংলাদেশের হেড অব পার্টনারশিপ, ফান্ডরেইজিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি মনজুন নাহার বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পুরুষের অংশগ্রহণ কম থাকায় নারীদের ওপরই বেশির ভাগ দায়িত্ব এসে পড়ে। এটি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, সামাজিক বৈষম্যেরও বহিঃপ্রকাশ। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা, উপকরণের সহজলভ্যতা এবং সঠিক প্রচারণার সমন্বয় ঘটাতে পারলে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে ভারসাম্য আসবে। পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।
প্রসঙ্গত; দেশে প্রচলিত গর্ভনিরোধক পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি খাবার বড়ি, কনডম ও ইনজেকশন; দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি আইইউডি বা কপার-টি এবং ইমপ্ল্যান্ট; এবং স্থায়ী পদ্ধতি পুরুষের এনএসভি ও নারীর টিউবেকটমি। অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরুরি গর্ভনিরোধক বড়িও ব্যবহার করা যায়। ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন পদ্ধতি উপযোগী, তা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।

