সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী জজ
প্রতিকূলতা মাড়িয়ে জয়ী ‘তুরি’র কাজল পাঁড়ে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের মাধাই গ্রামে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ‘তুরি’ সম্প্রদায়ে জন্মেছিলেন কাজল পাঁড়ে। শৈশবেই চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়েই তাকে জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হয়েছে। জোটেনি তিন বেলা খাবার। গ্রামের অন্য শিশুরা যখন খেলত, কাজল তখন অন্যের জমিতে কাজ করত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা জোগাড় করতে বাবা নরেশ পাঁড়ে নিজের একমাত্র সম্বল বাছুর বিক্রি করেছিলেন। আর মা পঞ্চমী জেড়ি ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সোনার নাকফুল।
কিন্তু সেই নরেশ-পঞ্চমী দম্পতির বাড়িতে এখন আনন্দের বন্যা। কাজল ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসাবে সুপারিশ পেয়েছেন। দুইশ জনের মধ্যে তার অবস্থান ১৪০তম। কাজলের স্বপ্নপূরণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামে নেমে এসেছে আনন্দের বন্যা।
মাধাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় কাজলের বয়স ছিল সাত বছর। ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গে বসতে চাইত না। শিক্ষকরাও তেমন মনোযোগ দিতেন না। একজন শিক্ষক বলেছিলেন, ‘তুরিদের ছেলেমেয়েরা বেশিদূর পড়ে না। ওদের মাথায় বিদ্যা ঢোকে না।’ কিন্তু কাজলের রোল নাম্বার যখন ডাকা হয় ক্লাস থ্রিতে, তখন সেই শিক্ষকও অবাক হয়েছিলেন। হাইস্কুলে ওঠার পর কাজলের বইয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। কিন্তু বই কেনার টাকা ছিল না। পুরোনো বই খুঁজে বেড়াত। বড় ভাইদের কাছ থেকে ধার নিত। দশম শ্রেণির শিক্ষক একদিন ক্লাসে বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি সত্যিই স্বপ্ন দেখতে চাও, তাহলে জেনে রাখো, স্বপ্নের কোনো জাত নেই, কোনো শ্রেণি নেই। কাজল সেদিনই প্রথমবার বুঝতে পেরেছিল, স্বপ্ন জিনিসটা আসলে কেমন। এভাবেই বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা তার মনে দৃঢ়ভাবে পোক্ত হয়ে ওঠে।
এসএসসি আর এইচএসসি পার করে যখন কাজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল, তখন গ্রামে এক অদ্ভুত শোরগোল উঠেছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন, তুরির ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে! খাওয়াবে কে! থাকবে কোথায়?
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার খরচ চালাতে কাজল দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই টিউশনি শুরু করে। সকালে ক্লাস। বিকালে টিউশনি। রাতে নিজের পড়াশোনা। এই তিনভাগে বিভক্ত জীবনে ঘুমের জন্য বরাদ্দ থাকত মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের খরচ চালাত। আবার মাসে মাসে বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কাজল প্রতিজ্ঞা করেছিল। বিচারক হবার জন্য সে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। স্নাতক শেষ করার পর কাজল বিসিএস এবং বিজেএস দুই পরীক্ষার জন্যই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। প্রস্তুতির বছরগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
পরীক্ষায় প্রথমবার সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয়বার যখন পরীক্ষায় বসল তখন তার মনে একটা অদ্ভুত শান্তি এসেছিল। বুধবারের জুডিশিয়ারির ফল বের হওয়ার পর কাজল বৃহস্পতিবার সকালে গ্রামে ফিরলে স্কুলের ছেলেমেয়েরা ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার মাথায়। বাড়ির উঠোনে ভিড় জমে যায়। প্রতিবেশী, আত্মীয়, এমনকি পাশের গ্রামের মানুষও কাজলকে একনজর দেখতে এসেছিলেন।
কাজল পাঁড়ে বলেন, ‘বিচারক হওয়ার সুপারিশ পাওয়া মানেই যাত্রার শেষ নয়। বরং এটা একটা নতুন দায়িত্বের শুরু। একজন বিচারকের আসনে বসে আমাকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। আমি আমার শিকড়কে ভুলব না। এই মাটি, এই গ্রাম, এই মানুষগুলো আমাকে যা শিখিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখব।’

