Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

সার নিয়ে উত্তপ্ত কুড়িগ্রাম

কৃষক-ডিলার-কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট

Advertisement

Icon

আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষক-ডিলার-কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট

Advertisement

কুড়িগ্রামে আবাদযোগ্য জমির সঠিক পরিসংখ্যান নেই কৃষি বিভাগের হাতে। সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সারের চাহিদা। ফলে জেলায় সার সংকট নিয়ে বিতর্ক কাটছেই না। সার লুট, রাস্তা অবরোধ, সারের ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই অবস্থায় কৃষক, ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট বিরাজ করছে।

বিশেষ করে সার বিতরণে তদারকি কাজে নিয়োজিত কৃষি কর্মকর্তারা এখন কৃষকের তোপের মুখে। ইতোমধ্যে একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও দুজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কৃষকের মারধরের শিকার হয়েছেন। অবরুদ্ধ হয়েছেন আরও দুই কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে কৃষকের নামে একটি মামলা হয়েছে। কারাভোগ করেছেন দুই কৃষক। গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অর্ধশতাধিক কৃষক। কৃষকের অভিযোগ, দিনের পর দিন ডিলার পয়েন্টে সার না পেলেও উচ্চমূল্যে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার মিলছে। এতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্কমর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এছাড়া ভুরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজীবপুরে ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনায় চাপে পড়েছে কৃষি বিভাগ। সার সংকট মোকাবিলায় এক হাজার টন সার বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। তবে কৃষি বিভাগের অদক্ষতার কারণে সরকারের প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে বসেছে। কুড়িগ্রামে সার লুট, কৃষকের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধসহ বিতরণে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা উপপরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) আবু মো. মনিরুজ্জামান জানান, স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন, ভুরুঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ও রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়াকে। বৃহস্পতিবার কৃষি বিভাগের উপপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবীর।

কৃষি কর্মকর্তাদের মারধর ও অবরুদ্ধ : রোববার সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নে সার বিতরণকালে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মামুন অর রশিদকে মারধর করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সোমবার সদর থানায় একটি অভিযোগ করা হয়। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নে সার বিতরণের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুল আলমকে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা মারধর করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ১১ জনের নাম উল্লেখ ও ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ভুরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। এই মামলায় আল আমিন ও সুরুজ মিয়া নামে দুই কৃষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৮ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরী বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারে সার না পোয়ে কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে গুদামে অবরুদ্ধ করেন কৃষকরা। তারা গাছের গুঁড়ি ফেলে মাদারগঞ্জ-ভুরুঙ্গামারী সড়ক অবরোধ করেন। একই দিন উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের গাবতলী বাজারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমারকে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা ঘেরাও করে। কৃষকরা সম্প্রতি চলমারী উপজেলা কৃষি অফিস ঘেরাও করে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের বারবার হয়রানি করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কৃষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার ব্যবস্থাপনায়। তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের কৃষক নুরুন্নবী সরকার, আব্দুল বাতেন ও সৈয়দ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাঠে লড়াই করে ফসল ফলাই। আমাদেরই সারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। কৃষি বিভাগের লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই কৃষকের। কৃষক চেনে না কৃষি কর্মকর্তারা। ফসলের ক্ষেত কখন কী চায় তা একমাত্র জানে বা বুঝতে পারে মাঠের কৃষক।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা : কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন জানান, আতঙ্ক নিয়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান বাবু বলেন, এক পরিবারের জন্য একাধিক কার্ড করা হয়েছে। তারা প্রভাব খাটিয়ে কার্ড দিয়ে সার উত্তোলন করে বেশি দরে বিক্রি করছে। কৃষকদের সঙ্গে কৃষি অফিসের সমন্বয় না থাকায় প্রকৃত কৃষক বাদ পড়ে যাচ্ছে। চিলমারী বিএনপির দলীয় সার মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক ফজলুল হক বলেন, কৃষি অফিসে কৃষকের কোনো ডেটাবেজ নেই। উপজেলা কৃষি অফিসার কনক চন্দ্রের দাবি, সারের কোনো সংকট নেই। কিছু ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ইতোমধ্যে অক্টোবর মাসের সারের বরাদ্দ এসেছে।

ভুরুঙ্গামারী সদর ও শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মাহাবুবুল আলম রিমন বলেন, আগের চেয়ে চাপ কমেছে। কৃষকদের বিক্ষোভ করার মতো কোনো ঘটনা যেন না ঘটে সে ব্যাপারে কৃষি বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। আমরা সার্বিক সহযোগিতা করছি। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, চাহিদার চেয়ে জেলায় বেশি সার নিয়ে আসা হয়েছে। আমন চাষে সার প্রয়োগ তেমন লাগে না। তারপরও সংকট কাটাতে চলতি মাসে অতিরিক্ত এক হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

ভূঞাপুরে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে মানববন্ধন : ভূঞাপুর প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের কুঠিবয়রা বাজারে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে স্থানীয় সার ব্যবসায়ী পিয়াসের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। বুধবার সন্ধ্যায় কুঠিবয়রা বাজার এলাকায় আয়োজিত মানববন্ধনে ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসান অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর সার বিক্রি কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ঘটনার সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম