Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

ঢাকি নেই মণ্ডপে, ঢাকের তালে সুরের সংকট

Advertisement

Icon

হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বোল, ধুনুচি নাচ আর উৎসবের আবহ। ঢাকের গম্ভীর শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ, ছন্দে ছন্দে চলে দেবীর আরাধনা। কিন্তু সেই চিরচেনা উৎসবের আবহেই এবার যেন বেজে উঠেছে সংকটের সুর। রংপুর বিভাগের গ্রামাঞ্চলে পেশাদার ঢাকির অভাবে অনেক মণ্ডপে এবার ঢাক বাজানোর দায়িত্ব তুলে নিতে হচ্ছে পূজা কমিটির সদস্যদের। কোথাও নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে নতুন ঢাক, কোথাও আবার পরিচিত কেউ ঢাক বাজিয়ে কোনোমতে সামাল দিচ্ছেন পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

ঢাক আছে, পূজাও আছে, আছে ভক্তদের ভিড়-শুধু নেই সেই অভিজ্ঞ ঢাকি। আরতির সময় বা বিশেষ পূজার ক্ষণে ঢাকের শব্দ না পাওয়া যেন উৎসবের আনন্দের মাঝেই এক ধরনের অপূর্ণতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্যানুযায়ী, এ বছর রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫ হাজার ১৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। সময়ের সঙ্গে মণ্ডপের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি পেশাদার ঢাকির সংখ্যা। বরং সারা বছর কাজের অনিশ্চয়তা, সীমিত আয় আর নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার নামুড়িহাট কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরে প্রতিবছর চুক্তিতে ঢাকি আনা হতো। এবার অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি পেশাদার ঢাকি। শেষ পর্যন্ত ৬ হাজার টাকা খরচ করে একটি ঢাক তৈরি করিয়ে নিয়েছে মন্দির কমিটি। এখন সেই ঢাক বাজিয়েই পালা করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সামলাচ্ছেন কমিটির সদস্যরা।

মন্দির কমিটির সদস্য নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, দুর্গাপূজায় ঢাকের বাদ্য অপরিহার্য হলেও এবার ঢাকি না পেয়ে বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়েছে। একজন ঢাকিকে পূজার সময় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়। তাই নিজেদের একটি ঢাক থাকলে আগামী তিন-চার বছর ব্যবহার করা যাবে-এমন চিন্তা থেকেই তারা ঢাকটি তৈরি করিয়েছেন। তবে নতুন ঢাক কেনা গেলেও পেশাদার ঢাকির অভাব পূরণ হচ্ছে না। নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, কমিটির সদস্যরা পালা করে ঢাক বাজাচ্ছেন। একই চিত্র কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গারডাবরীর দুর্গামন্দিরেও। গত বছর ১৩ হাজার টাকা চুক্তিতে সেখানে একজন ঢাকি এসেছিলেন। এবার তাকে আর পাওয়া যায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও বিকল্প কাউকে না পেয়ে মণ্ডপ কমিটি ৮ হাজার টাকা খরচ করে একটি ঢাক তৈরি করিয়েছে।

কমিটির সদস্য অবিনাশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, ঢাকির সংকটে পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় কেউ কেউ ঢাক বাজাতে পারলেও পেশাদার ঢাকিদের মতো তাল ও ছন্দ বজায় রাখা কঠিন। তাই বাধ্য হয়েই কমিটির সদস্যরা ঢাক বাজানোর দায়িত্ব পালন করছেন। রাজারহাটের এই চিত্র কেবল একটি মন্দিরের নয়; বরং গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিফলন। যে ঢাকের শব্দ একসময় পূজামণ্ডপের পরিচিত অনুষঙ্গ ছিল, সেই ঢাকের তালে ছন্দ ধরে রাখতে এখন আয়োজকদেরই হতে হচ্ছে ঢাকি।

ঢাকিদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গেলে সামনে আসে জীবিকার অনিশ্চয়তা। দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় তাদের হাতে থাকে না নিয়মিত কাজ। শুধু একটি মৌসুমের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো কঠিন। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকায় ঢাক বাজানোকে পেশা হিসাবে নিতে আগ্রহী হচ্ছে না।

লালমনিরহাট শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দিরে ১৫ বছর ধরে ঢাক বাজাচ্ছেন বাবুল চন্দ্র দাস। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, গ্রামের অনেক মন্দিরেই আগের মতো নির্ধারিত ঢাকি নেই। সারা বছর কাজ না থাকায় অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। রংপুরের মুলাটোলার নির্ধারিত ঢাকি সুখেন দাসও দেখছেন একই পরিণতি। তার মতে, শহর ও গ্রামের পারিশ্রমিকের ব্যবধানও এই পেশার বাস্তবতাকে তুলে ধরে। দুর্গাপূজার সময় শহরে ঢাকিরা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পেলেও গ্রামে পান ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। তবু এই আয় সারা বছরের জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়।

সুখেন দাসের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ঢাকির সংকট আরও তীব্র হবে। একসময় হয়তো এই পেশায় নতুন মানুষ আসবেন না, হারিয়ে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকট খুলনার অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ

খুলনার অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ

ঢাকি নেই মণ্ডপে, ঢাকের তালে সুরের সংকট

ঢাকি নেই মণ্ডপে, ঢাকের তালে সুরের সংকট

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বরাদ্দের টাকায় নেতার বাড়ির রাস্তা সংস্কার

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বরাদ্দের টাকায় নেতার বাড়ির রাস্তা সংস্কার

বিচ কার্নিভাল ও দুর্গাপূজা কুয়াকাটায় ৮০ শতাংশ হোটেলের কক্ষ বুক

কুয়াকাটায় ৮০ শতাংশ হোটেলের কক্ষ বুক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম