যুক্তরাজ্যে চার কোম্পানি খুলে বিনিয়োগ
সাবেক শিবির নেতার বিপুল অর্থ পাচার
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়োফার্মার নির্বাহী পরিচালক পরিচয়ের আড়ালে শিবির নেতা ডা. লকিয়ত উল্লাহ প্রকাশ্যে চলেন মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে
Advertisement
মাহবুব আলম লাবলু
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যুক্তরাজ্যে বিপুল অর্থ পাচার করেছেন ছাত্র শিবিরের সাবেক নেতা ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়োফার্মা লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ডা. লকিয়ত উল্লাহ মিলন। বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন ছাড়াই সেখানে অন্তত চারটি কোম্পানি খুলে বিনিয়োগ করেছেন ওই অর্থ। যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে সপরিবারে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন তার স্ত্রী মুশফিকা আশরাফ। আবেদনে স্বামী জামায়াতের নির্যাতিত নেতা হিসাবে উল্লেখ করে স্ত্রী ও দুই কন্যা সেখানেই গড়েছেন বসতি। অথচ দেশে সরকারি দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন লকিয়ত উল্লাহ। তার এই দ্বৈত আচরণ ও মনোভাবে ঘনিষ্ঠজনরাও হতবাক। যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে করা আবেদন ও কোম্পানি ডকুমেন্টসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।
অভিযোগ আছে, বিদেশে কোম্পানি খুলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করলেও গত ১৫ বছর ধরে বায়োফার্মা লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। সরকারি চাপ ও হয়রানির অজুহাতে ২০০৮ সাল থেকে কোম্পানির সাধারণ সভাও বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্য পরিচালকদের লকিয়ত উল্লাহ বুঝিয়েছেন সাধারণ সভা করে লভ্যাংশ বিতরণ করলে ‘জামায়াত কানেকশনে’ কোম্পানি হাতছাড়া হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নানা কারসাজির মাধ্যমে তিনি কোম্পানির প্রায় ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন। বিষয়টি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তদন্তেও ধরা পড়েছে। এই অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারের তথ্যপ্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার চট্টগ্রামের পূর্ব মাদারবাড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন কাউসার খান। আদালতের নির্দেশে তার এই অর্থ পাচারের ঘটনা অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দিয়েছে। অনুসন্ধান শেষে কমিটি হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।’
নিজস্ব অনুসন্ধানকালে, যুক্তরাজ্যের কোম্পানি নিবন্ধন দপ্তরের নথিও এসেছে যুগান্তরের হাতে। তাতে দেখা গেছে, গত ৮ মার্চ বায়ো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড নামের কোম্পনি খোলা হয়। যার অফিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে-১১৩ নিউ রোড, ই১ ১এইচজে, ফাস্ট ফ্লোর, লন্ডন। নিবন্ধন নম্বর-১৪৭১৫১২২। নথিপত্রে দেখা গেছে, কোম্পানির একমাত্র পরিচালক লকিয়ত উল্লাহ। শেয়ার সংখ্যা একটি। যার মূল্য এক পাউন্ড। এই কোম্পানি যে কোনো সময় মিলিয়ন, বিলিয়ন পাউন্ডে রূপান্তর করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোম্পানিটির নামে হোলসেল ব্যবসার আড়ালে দুবাইসহ মধ্যপ্রচ্যের কয়েকটি দেশ হয়ে শত শত কোটি টাকা লন্ডনে পাচার করছেন তিনি। ২০১৮ সালে তিনি আরেকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম ‘নবাব ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট লিমিটেড’। নিবন্ধন নম্বর ১২২৭৮৩১৮। ঠিকানা-৯ ফ্রিমলি হাই স্ট্রিট, লন্ডন জিইউ১৬ ৫এইচওয়াই। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৭ পাউন্ড। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রেস্টুরেন্টের শেয়ার মূল্য ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৭ পাউন্ড, স্থায়ী সম্পদ মূল্য ৫০ হাজার পাউন্ড, বর্তমান সম্পদ মূল্য ৫০ হাজার পাউন্ড ও ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আয় দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ পাউন্ড। ৩০ মার্চ ২০২২ সালের কোম্পানি বোর্ড সভায় অনুমোদিত এই হিসাব শিটে পরিচালক লকিয়ত উল্লাহর সই রয়েছে। এ ছাড়াও ভিলা আরবিনা লিমিটেড নামের একটি পুরোনো কোম্পানি কিনে নাম পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লকি কিচেন।’ ২০১৮ সালে কেনা এই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা যুক্তরাজ্যের পর্যটন এলাকা হিসাবে খ্যাত ২৪এ ইয়র্কটাউন রোড, স্যান্ডহার্স্ট, লন্ডন জিইউ৪৭৯ডিটি। লন্ডনে তার আরও একটি কোম্পানি থাকলেও নাম-ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য দেশ থেকে অবৈধ পথে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, লকিয়তের পাচার করা অর্থের পরিমাণ অন্তত ৫০০ কোটি টাকা। আর নানা-অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে এই অর্থ তিনি সরিয়েছেন এক সময়ের নাম করা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়োফার্মা লিমিটেড থেকে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক পদে থাকার সুবাদে নানা কৌশলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
জানা গেছে, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সবাই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে জড়িত। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলাচল করতে পারেন না। তারই সুযোগ নিচ্ছেন লকিয়ত উল্লাহ। তিনি কোম্পানির অধিনে থাকা আরও অন্তত ১২টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে অর্থ সরিয়ে বিদেশে পাচার করছেন। তার এই অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্তে গত ২৪ মে দুদককে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এই আদেশের বিরুদ্ধে বায়োফার্মা লিমিটেডের পক্ষে আপিল করা হলেও তা খারিজ করে দেওয়া হয়।
কে এই লকিয়ত উল্লাহ : ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন লকিয়ত উল্লাহ। এর আগে একই ইউনিটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এমবিবিএস পাশ করার পর তিনি চট্টগ্রাম মহানগর শিবিরের বায়তুল মাল সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মাহবুব আলম হত্যা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) ছাত্রবাসে বস্তায় ভরে পিটিয়ে মাহবুবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে চমেক ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী এই মামলার বাদী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুই ছাত্রদল নেতা খুনের মামলারও আসামি এই লকিয়ত। তার পরিকল্পনায় আলোচিত ওই জোড়া খুন সংঘটিত হয়েছিল বলে তৎকালীন ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। মেডিকেলে পড়ার সময়ই তিনি অন্তত তিনটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। তিনি জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টর ফোরামের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। জামায়াতপন্থি ব্যবসায়ীদের এনজিও আমানের পরিচালকও তিনি। ২০১৮ সালে লকিয়তসহ বায়োফার্মার তিন পরিচালকের বিরুদ্ধে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে একাধিক মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় লকিয়তকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এরপর পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে এক সময় শিবির নেতার পরিচয় ছাপিয়ে বায়োফার্মার নির্বাহী পরিচালকের পরিচয়ে তিনি প্রকাশ্যে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারও করতে থাকেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, সিলেটের নবনির্বাচিত মেয়রসহ অনেকের সঙ্গে তার তোলা ছবি এ প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। আর ওদিকে নির্যাতিত জামায়াত নেতার স্ত্রী হিসাবে মুশফিকা আশরাফ যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। আবেদনে তার ওপর নির্ভরশীল হিসাবে দুই কন্যার নাম রয়েছে। তারা আর বাংলাদেশে ফিরতে চান না বলেও উল্লেখ করেছেন আবেদনে। লকিয়তও নিয়মিত লন্ডনে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেন।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. লকিয়ত উল্লাহর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে একই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে প্রশ্ন পাঠালেও কোনো জবাব দেননি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় সরাসরি গিয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
