শহিদ পরিবারগুলোর জীবন এখন ঝুঁকিতে: সাকিব রহমান
Advertisement
তোহুর আহমদ
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে শহিদ সেনা পরিবারের সন্তান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক সাকিব রহমান বলেছেন, বর্তমানে পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমন এক ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে যাতে শহিদ পরিবারগুলোর জীবন এক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জওয়ানদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না-এমন ন্যারেটিভের প্রচার দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। অথচ সে সময় পিলখানায় চালানো হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতার ভিডিওচিত্র দেখলে এখনো গা শিউরে ওঠে।
সোমবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্তে আলাপকালে সাকিব বলেন, নিরপরাধ জওয়ানদের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ নেই। তাদের দাবি একটাই-যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের যেন ছাড় দেওয়া না হয়। এছাড়া সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়) আওতায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দলের কতিপয় নেতার বিচার হতে হবে। সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার নেপথ্যে পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব অবশ্যই বর্তমান সরকারের কাঁধে রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সাকিব বলেন, হাসিনার রেজিমে এসব নিয়ে তাদের স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ২৫ ফেব্রুয়ারি বনানী সামরিক কবরস্থানে গেলেও শহিদ পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি করা হয়েছে। এ সময় সাহস করে কেউ মিডিয়াকর্মীদের কাছে গেলে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সেখানে হাজির হয়ে যেত। কে কী বলছে বিস্তারিত নোট করত। তবে ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে বর্তমানে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেখানে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো তার (হাসিনার) ভয় ছিল। আমরা গোপন কোনো তথ্য ফাঁস করে দেব। এজন্য মিডিয়ার কাছ থেকে আমাদের দূরে রাখা হতো। কিন্তু আমরা মনে করি-পিলখানায় যে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে তার দায় শেখ হাসিনা এবং তার কতিপয় নেতাকে নিতে হবে। অন্তত সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির জায়গা থেকে তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
সাকিব বলেন, তার বাবা কর্নেল কদুরত ইলাহী রহমান শফিক তৎকালীন বিডিআরের দিনাজপুর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় দরবারে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। কিন্তু সেখানে তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ পিলখানার ভেতরে লুকিয়ে রাখা এক গণকবর থেকে উদ্ধার করে সেনাবাহিনী।
স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ঘটনার মাত্র এক মাস আগে সেনাবাহিনী থেকে বাবাকে বিডিআরে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। পিলখানায় অনুষ্ঠিত দরবারে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। ২১ ফেব্রুয়ারি তার সঙ্গে আমার শেষবারের মতো দেখা হয়। এ সময় আমি বাবাকে জীবনে প্রথম এবং একবারই বিডিআরের ইউনিফর্মে দেখেছিলাম। এ সময় আমি বলি-এই পোশাকে তোমাকে একটুও ভালো লাগছে না। বাবা বলেছিলেন, অল্প কিছুদিন। শিগগিরই তিনি ফের সেনাবাহিনীতে ফিরে যাবেন। কিন্তু সামরিক বাহিনীতে তার ফিরে যাওয়া আর হয়নি। ২৭ তারিখ পিলখানার ভেতরে লুকিয়ে রাখা গণকবর থেকে বেশ কয়েকজন অফিসারের লাশ উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বাবার লাশ শনাক্ত করা হয়। পরে সব লাশ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়।
সাকিব বলেন, হাসিনার পতনের পর পিলখানার ঘটনা নিয়ে ভিন্ন এক ন্যারেটিভ প্রচার করা হচ্ছে। হাজার হাজার নিরপরাধ জওয়ানদের বন্দি রাখার কথাও বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ২০১০ সালে বিচার শুরুর পর থেকে মাত্র ১৩৯ জন বিডিআর জওয়ান হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন। এছাড়া ১৮৫ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। বাকি প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ জনের বিচার হয়েছে বিডিআরের নিজস্ব আইনে। যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের দণ্ড। ইতোমধ্যে তাদের সবাই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। শুধু বিস্ফোরক মামলায় চারশর মতো আসামি কারাবন্দি ছিলেন। বর্তমানে তাদের পরিবারের আন্দোলনের মুখে অনেককে জামিন দেওয়া হচ্ছে।
সাকিব বলেন, জওয়ানদের জামিন বা চাকরিতে পুনর্বহাল অথবা ক্ষতিপূরণের কোনো কিছুতেই তাদের আপত্তি নেই। এমনকি যারা হত্যা মামলায় ফাঁসি বা যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও রায় পুনর্বিবেচনা হতে পারে। কিন্তু এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, জওয়ানদের কেউ কিলিং মিশনে অংশ নেয়নি। বন্দিদের সবাই নিরপরাধ ছিলেন এমন কথা বলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যে কোনো মূল্যে ঘটনার একটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
সাকিব বলেন, হাসিনার আমলে পিলখানার শহিদ পরিবারকে প্লট, ফ্ল্যাট এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে মোটা অঙ্কের অর্থসহ অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছে। অথচ এর কোনো ভিত্তি নেই। বাস্তবে শহিদ ৫৭ অফিসারের প্রত্যেক পরিবারকে মাত্র ১৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এর বাইরে জুনিয়র অফিসারদের কয়েকটি পরিবারকে ডিওএইচএস এলাকায় ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অথচ বাইরে প্রচার আছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে শহিদ মইনুল রোডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাড়ি ভেঙে সেখানে পিলখানায় শহিদ অফিসারদের পরিবারকে ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। যা একেবারেই মিথ্যা।
সাকিব বলেন, তখন বিএনপি কর্মীদের শান্ত রাখতে হয়তো শেখ হাসিনা এ ধরনের অপকৌশল বেছে নিয়েছিলেন। বাস্তবে যে কেউ সেখানে গেলে দেখতে পাবে খালেদা জিয়ার বাড়ি ভেঙে সেখানে কয়েকটি বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর নিয়মিত সার্ভিং কর্মকর্তারাই পোস্টিং অনুযায়ী সেখানে থাকেন। কোনো শহিদ পরিবারকে সেখানে কোনো ফ্ল্যাট দেওয়া হয়নি।
সাকিব বলেন, হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় পতিত আওয়ামী লীগের কাছ থেকে হুমকি আসতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে শহিদ পরিবারের অনেকেই বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এছাড়া চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যরাও হয়তো আমাদের প্রতিপক্ষ মনে করে। এ কারণে তাদের কাছ থেকেও আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ অবস্থায় আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। বলছি, বিডিআরের যারা চাকরিচ্যুত তাদের দাবি রাষ্ট্রের কাছে। সরকার তাদের চাকরি ফিরিয়ে দিলে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি নেই।
সাকিব বলেন, পহেলা ফেব্রুয়ারি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে শহিদ পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় আমাদের মূল দাবি ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি শহিদ সেনা দিবস ঘোষণা করতে হবে। ইতোমধ্যে সেটা কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়া জড়িতদের বিচার এবং জামিন নিয়ে আমাদের কথা হয়। সেনাপ্রধান বলেছেন, এটি আদালতের এখতিয়ার। এখানে সেনাবাহিনীর তেমন কিছুই করার নেই। তবে প্রত্যাশিত কিছু হবে না এমনটা প্রত্যাশা করেন সেনাপ্রধান।
পিলখানায় শহিদ কর্মকর্তাদের পরিবারের সব সদস্য এক জায়গায় আসার চেষ্টা করছে জানিয়ে সাকিব বলেন, নিহত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইতোমধ্যে শহিদ সেনা অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয়েছে। এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এতে যোগ দিয়েছে শহিদ ৪৫ জনের পরিবার। কিন্তু বাকি পরিবারগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযাগ করতে পারিনি। হয়তো বা তারা দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। অথবা জীবনের বাস্তবতায় নতুন করে অন্য কোনো পরিচয়ে তারা টিকে আছেন। কিংবা এমনটাও হতে পারে-অভিমানে তারা এখন আর সামনে আসতে চাইছেন না।
বিডিআর কল্যাণ পরিষদের বক্তব্য : বিডিআর কল্যাণ পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা সুবেদার ফখরুদ্দিন হাসান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের একটাই দাবি-কমিশন মামলার পুনঃতদন্ত করুক। পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক।
সংগঠনটির সভাপতি ফয়জুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ৫ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছি। পরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আমাদের দাবিগুলো যুক্তিসম্মত মনে করে এগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
