পুলিশ থেকে অবসর নিয়ে আ.লীগের এমপি
বগুড়ার হাবিবরের তাক লাগানো সম্পদ
কেউ কথা বললেই সাজানো মামলায় করা হতো হয়রানি
Advertisement
বগুড়া ব্যুরো
প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আলহাজ হাবিবর রহমান পুলিশ কর্মকর্তা থেকে অবসর নিয়ে আওয়ামী লীগের টিকিটে পরপর তিনবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে সুফি, সাধু ও ভদ্রবেশে থাকলেও উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে তিনি শুধু ভিন্নমতের নয়; নিজ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও রাজনীতি হারাম করে দেন। এসব অপকর্মে তাকে সহযোগিতা করেন ছেলে আসিফ ইকবাল সনি ও ব্যক্তিগত সহকারী মিলন। টানা তিনবার এমপি হওয়ায় তিনি নিজের এবং ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকটি মামলা হওয়ায় বাবা ও ছেলে আত্মগোপন করেছেন। শেরপুরের প্রাসাদোপম বাড়ি, মাছভরা পুকুর, গোয়াল ভরা গরু, হরিণের খামার ও বাগান ফাঁকা পড়ে আছে। ইতোমধ্যে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বাবা ও ছেলের দেশ্যত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আদালত সাবেক এমপির বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা সাতটি হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন। শুধু এলাকার ভিন্ন রাজনৈতিক দল নয়; নিজ দলের নির্যাতিত নেতাকর্মীরাও সাবেক এমপি ও তার ছেলেকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে হাবিবর রহমান ও ছেলে ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল সনি ক্ষমতার অপব্যবহার, হাটের ইজারা ও টেন্ডার বাণিজ্য, পদ বাণিজ্য, টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন আদায়, জমি, পুকুর এবং বিল দখলসহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। একসময় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও তিন মেয়াদে এমপি থাকায় প্রায় সাড়ে ৩০০ গুণ সম্পদ বাড়িয়েছেন। নিজের পাশাপাশি ছেলে, আত্মীয়স্বজন ও ব্যক্তিগত সহকারীও কোটিপতি হয়েছেন।
নামে-বেনামে যত সম্পদ : ধুনটের জালশুকা গ্রামে পৈতৃক বাড়ির পাশে বিল-বাইশার ৭০ বিঘা দখল করে এর সঙ্গে দেড়শ বিঘা জমি নিয়ে হাবিবর রহমান গড়ে তোলেন ‘বাবু পার্ক সিটি’। ধুনট সদরে ২১ শতাংশ জায়গার ওপর কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্যিক ভবন, শেরপুরের ছোনকায় ছেলের নামে ৫০ বিঘা জমির ওপর আসিফ ব্রিক ফিল্ড, দুবলাগাড়িতে প্রাসাদোপম বাগানবাড়ি ও হিমাগার, ঢাকার নিকুঞ্জে বাবা ও ছেলের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি, ছোট-বড় ট্রাকসহ রয়েছে বেশ কয়েকটি আধুনিক গাড়ি। দেশের বাইরেও অনেক টাকা পাচার করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্য : হাবিবর রহমান ধুনট উপজেলায় ৩৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৭টি টেকনিক্যাল ও ডিগ্রি কলেজ এবং মাদ্রাসায় ছেলে, ভাই ও ভাতিজাদের সভাপতি বানিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করেছেন। নির্বাচনি এলাকায় বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প বানিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দের অনেক প্রকল্পের কাজ তেমন হয়নি। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা প্রকল্পের সভাপতি হিসাবে শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেছেন। কিছু কাজ দেখিয়ে প্রকল্পের অধিকাংশ টাকা সাবেক এমপির ছেলে ও তাদের লোকজন ভাগবাঁটোয়ারা করেছেন।
নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জানান, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমপির নামে বিশেষ বরাদ্দের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে প্রতি অর্থবছরে ৮০০ থেকে ৯০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ আসত। এর বেশির ভাগ নামসর্বস্ব ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির ৬০ শতাংশ এমপির ছেলে ও পিএস মিলনকে দিতে হতো। এতিমদের জন্য বরাদ্দের ৪০ মেট্রিক টন চাল পিএস মিলন কালোবাজারে বিক্রি করে সমালোচিত হন।
সাজানো মামলায় হয়রানি : বাবা-ছেলের সমালোচনা করলেই সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হতো। তাদের মামলার আসামি হয়েছেন ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি টিআইএম নুরুন্নবী তারিক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল হাই খোকনসহ অসংখ্য নেতাকর্মী। এলাঙ্গী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সোহানুর রহমান অসীম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রাসেল মাহমুদ, আওয়ামী লীগ নেতা রিয়েল আহম্মেদ জান্নাত, আরিফুর রহমান, যুবলীগ নেতা আনিসুর রহমান, চিকাশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলেফ বাদশা, যুগ্ম সম্পাদক ইউপি সদস্য মোখলেছার রহমান, সদস্য সিরাজুল ইসলাম, ওয়ার্ড সভাপতি শিপন মিয়া, যুবলীগ নেতা পলাশ হাসান প্রমুখের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন।
২০১৮ সালের ৩১ মে হাবিবর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত শুরু হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে তাদের জায়গা-জমি, ফ্ল্যাট কেনাবেচা-সংক্রান্ত রেকর্ডের ছায়ালিপি চেয়ে বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রারকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই তদন্ত পরে আর আলোর মুখ দেখেনি।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তের পর থেকে পরিবার নিয়ে আত্মগোপন করেছেন প্রভাবশালী সাবেক পুলিশ সুপার ও সাবেক এমপি হাবিবর রহমান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় বাবা ও ছেলের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে।
ধুনটের চৌকিবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, হাবিবর রহমান জালশুকায় বাবু সিটি পার্কের প্রায় ১৮০ বিঘা জমি ক্রয় করেন ও ৮০ বিঘা সরকারি জলাশয় ১০০ বছরের জন্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লিজ নিয়েছেন। এতে করে জেলেদের পেটে লাথি মারা হয়েছে। তিনি এই লিজ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলম মামুন বলেন, গত ১৫ বছরে স্কুল-কলেজে নিয়োগে শতকোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন হাবিবর। টিআর, কাবিখাসহ সরকারি প্রকল্পে তার অনিয়মের কথা বলে শেষ করা যাবে না। শেরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম বাবলু বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে হাবিবর রহমান ঋণগ্রস্ত ছিলেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলেন।
