Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

জুলাই আন্দোলনে রাজশাহীর ১৩৮ মামলা

এক বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

আগস্টেই ১৮টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে -পুলিশ

Advertisement

Icon

আনু মোস্তফা, রাজশাহী

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া ১৩৮ মামলার তদন্ত কাজ গত এক বছরেও শেষ হয়নি। এছাড়া আদালতে বিভিন্ন ধারায় দায়ের হওয়া শতাধিক মামলার তদন্তেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন ছাড়াও অতীতের বিভিন্ন পুরোনো ঘটনায় অনেক মামলা হয়েছে আদালতে। আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বিভাগে থানা ও আদালতে দায়ের হওয়া মামলার মোট সংখ্যা ২৩৮টি। এসব মামলার মধ্যে থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্ত করছে থানা পুলিশ। অন্যদিকে আদালতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অধিকাংশই তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশান-পিবিআই। যদিও পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের কাছে আসা মামলাগুলোর অনেকগুলোর অভিযোগ পাঁচ থেকে ১৫ বছরের পুরোনো। যে কারণে অভিযোগের প্রমাণ সংগ্রহে অনেক সময় লাগছে।

রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর তদন্তের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। অনেকগুলো মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তারা আরও বলছেন অভিযোগের প্রমাণ জোগাড়, আসামিদের নাম-ঠিকানা পরিচয় শনাক্ত করা, তথ্য উপাত্ত নিরীক্ষা করা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া ছাড়াও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে সময় লাগায় মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হয়নি। আরও জানা গেছে, জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত আহত পরিবারসহ মামলাগুলোর বাদীরা মাঝেমাঝেই সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তারা ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন।

পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সূত্র মতে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গত বছর জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটে। এসব অভিযোগে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন থানায় মোট ১৩৮টি মামলা দায়ের করেন জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধারা নিজে ও পরিবারের সদস্যরা। এসব মামলার মধ্যে ২২টি হত্যা মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ৯টি হত্যা মামলা রয়েছে বগুড়া জেলায়। এছাড়া বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলায় আটটি, রাজশাহীতে দুটি, জয়পুরহাট জেলায় দুটি এবং পাবনা জেলায় একটি হত্যা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক ৪৫টি মামলা হয়েছে রাজশাহী জেলা ও মহানগর এলাকায়। এর মধ্যে রাজশাহী মহানগরীর ১২ থানায় দুটি হত্যাসহ তদন্তাধীন রয়েছে বিভিন্ন ধারায় রুজুকৃত ২৯টি মামলা। অন্যদিকে রাজশাহী জেলা পুলিশের ৯ থানা এলাকায় বিভিন্ন ধারায় হয়েছে ১৬টি মামলা। মামলাগুলোর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ১৮টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে দ্রুতগতিতে। এছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে এসব অভিযোগে আরও ২৬টি মামলা হয়েছে যেগুলোর অধিকাংশই পিবিআই তদন্ত করছেন। আদালতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর এসব মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি ড. মোহাম্মদ শাজাহান যুগান্তরকে জানান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মোট ৮০টি মামলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করা হচ্ছে। এসব মামলার মধ্যে রাজশাহী মহানগর এলাকার ২৭টি মামলা ছাড়াও জয়পুরহাট জেলার ৮টি, বগুড়া জেলায় ২৩টি, সিরাজগঞ্জের ৬টি, পাবনায় ৫টি, নওগাঁ জেলায় চারটি, নাটোরে চারটি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩টি মামলা রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব মামলা তদন্তের কাজ নিয়মিত তদারক করছেন। তিনি আরও বলেন, রাজশাহী রেঞ্জ এলাকার বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া ২২টি হত্যা মামলার মধ্যে চলতি আগস্টে ১৮টি হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব মামলার চার্জশিট দাখিলের আগে ছাড়পত্রের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের মনিটরিং সেলে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর সহিংস হামলার ঘটনায় রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় দায়ের হওয়া ১৩৮ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৮ হাজার ৪৯৩ জন। অন্যদিকে বিভাগের ২২টি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা এক হাজার ৯৫০ জন। এসব মামলায় ৩১ জুলাই পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাত মিলে গ্রেফতার হয়েছে এক হাজার ৯০৫ জন আসামি। তাদের অধিকাংশই কারাগারে রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজশাহী বিভাগে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় হত্যাসহ অন্য ধারায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনার আলোকে মামলাগুলোর তদন্ত করা হচ্ছে। তারা আরও বলছেন, রাজশাহী বিভাগে ২২ হত্যাসহ বিভিন্ন ধারায় দায়ের হওয়া মোট ১১৮টি মামলা পুলিশ সদর দপ্তর পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা জানিয়েছেন, বিভাগের ২২ হত্যা মামলার মধ্যে ১৮টি মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চলতি আগস্টের মধ্যে এই ১৮টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে।

এদিকে রাজশাহী মহানগর এলাকায় জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দুটি হত্যাসহ মোট ২৮টি মামলা হয়েছিল নগরীর বিভিন্ন থানায়। এর মধ্যে ২৩টি মামলা তদন্ত করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এই ২৮টি মামলার মধ্যে দুটি মামলার সত্যতা নিয়ে সংশয় থাকলেও বাকি ২৬টি মামলার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এর মধ্যে চলতি আগস্টে মোট ১০টি মামলার চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। বাকিগুলোরও প্রতিবেদন দ্রুত সময়ে আদালতে দাখিল করা হবে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সকল থানা ও গোয়েন্দা বিভাগ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (সিটি-ডিবি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত বছর ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজশাহীর অধিকাংশ থানা ও ফাঁড়ি এমনকি আরএমপির সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে। পাশাপাশি অভ্যুত্থান পরবর্তীতে দায়ের হওয়া কিছু মামলায় বেশ অসংগতি ছিল। কিছু মামলায় বাদী বা অভিযোগকারী যথেষ্ট তথ্য প্রমাণও উল্লেখ করেননি। অনেকেই ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বিভিন্ন জনকে ফাঁসাতে অনেক মামলায় ঘটনায় জড়িত নয়-এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করেন। এসব ঠিকঠাক করতে পুলিশের অনেক সময় গেছে। ফলে মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়েছে। যদিও বর্তমানে নির্ধারিত মামলাগুলোর প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তৈরি হয়ে গেছে।

এদিকে গত বছর ৫ আগস্ট রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানা এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি ও বোমা হামলায় নিহত হন শিবির কর্মী সাকিব আনজুম। পরে তার বাবা মাইনুল হক বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে অগ্রগতির বিষয়ে সাকিব আনজুমের বাবা মাইনুল হক জানান, প্রথম দিকে মামলার তদন্তে তেমন অগ্রগতি ছিল না। তবে ইতোমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করেছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। আশা করি, আমি ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে পাব।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম