Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

চলনবিলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই হচ্ছে নিজস্ব ক্যাম্পাস

৫১৯ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে উঠছে আজ

Advertisement

Icon

হামিদ-উজ-জামান

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একাডেমিক পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে চলনবিলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলনবিলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হওয়ায় এর নির্মাণব্যয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর পড়বে বিরূপ প্রভাবও। এসব কারণে এর আগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ বিষয়ে আপত্তি দিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। এরপর একনেকে উপস্থাপন করা হলে সেখান থেকেও ফেরত পাঠানো হয়। তখন একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান এবং পরিবেশসংক্রান্ত ছাড়পত্রসহ প্রস্তাবটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়। কিন্তু এতেও কাজ হয়নি। বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে এমনকি পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়েই তৈরি করা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাব। শুধু পাঁচ সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে প্রকল্প স্থাপন এবং পরামর্শক খাতে ব্যয়ের নিড এসেসমেন্ট করা হয়েছে। এ অবস্থায় ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ স্থাপন’ নামের একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে আজ রোববার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তাবে পরিপূর্ণ মাস্টারপ্ল্যান সংযুক্ত করা হয়নি। যা দেওয়া হয়েছে সেখানেও মাস্টারপ্ল্যান সম্পাদনকারীর কোনো স্বাক্ষর নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া পরামর্শক খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ছয় কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে বলেছিল পরিকল্পনা কমিশন। এদিকে প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত স্থানটি বছরের চার মাস পানির নিচে থাকে। এটি ৯ থেকে ১৪ মিটার উচ্চতায় ভরাট করতে হবে। ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজন হবে সড়ক সেতু, বাস্তবায়ন করতে হবে বাঁধসহ আনুষঙ্গিক নানা কার্যক্রম। এছাড়া বিল ভরাটে নদীর পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে মাছের প্রজনন নষ্ট হতে পারে। সেই সঙ্গে পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং জলজ জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক সংকটে পড়বে।

পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটির প্রস্তাবটি আসে। এরপর এটি নিয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পিইসি সভা। সেখানে সুপারিশে বলা হয়েছিল, ১০০ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের ভিত্তিতে প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করে একটি একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার পরিমাণ ও ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে প্রয়োজনীয় আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার পরিমাণ ও ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটি বলেছে, পরিপূর্ণভাবে মাস্টারপ্ল্যান সংযুক্ত করা হয়নি। তবে পিইসি সভার পরে পাঁচ সদস্য (বহিঃসদস্যসহ) বিশিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের স্থাপনা এবং পরামর্শক খাতে ব্যয়ের নিড এসেসমেন্ট করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে গত ৭ মে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদন না দিয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি বৈশ্বিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য ধারণ করার মতো ধারণাপত্র তৈরি করতে বলা হয়। সেইসঙ্গে একটি ভৌত অবকাঠামোগত নকশা (মাস্টারপ্ল্যান) করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভূমির প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়গুলো অধিক যাচাইবাছাই করে ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যুক্ত করতে বলা হয়। সেইসঙ্গে প্রকল্পের কার্যক্রম ও প্রাক্কলিত ব্যয় বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে প্রস্তাবিত সংশোধিত ডিপিপিতে পাঁচ পৃষ্ঠার একটি ধারণাপত্র সংযুক্ত করা হলেও প্রকল্পের কার্যক্রম ও প্রাক্কলিত ব্যয় বিষয়ে দেওয়া সুপারিশ প্রতিপালন হয়নি। অর্থাৎ এর আগে উপস্থাপিত ডিপিপিতে রাখা কার্যক্রম ও ব্যয় এখনকার ডিপিপির সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য নেই। এছাড়া সুপারিশের পরও পরিবেশ-সংক্রান্ত বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, মানসম্মত উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন, রবীন্দ্র অধ্যায়ন, বিজ্ঞানমনস্ক দক্ষ ও প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ মানবসম্পদ গড়তে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যুগোপযোগী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন। এর আগে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাশ করা হয়। বর্তমানে চারটি অনুষদের অধীন পাঁচটি বিভাগে পাঠদান চলছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শাহজাদপুর উপজেলার স্থানীয় তিনটি কলেজে পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কলেজের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছিল। ইতোমধ্যেই চুক্তির মেয়াদ শেষ। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনোভাবেই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে না। প্রতিটি বিভাগ এবং শিক্ষাবর্ষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়ে গেছে। ফলে শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও অফিসকক্ষের সংকট দিন দিন বেড়েই চলছে। এ অবস্থায় দ্রুততার সঙ্গে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করা না গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হলো-পাঁচতলা ভিতের উপর পাঁচতলা আলাদা একাডেমিক ও প্রশাসসিক ভবন নির্মাণ, তিনতলা ভিতের উপর তিনতলা সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ভবন, দুইতলা টিএসসি অ্যান্ড ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণ করা হবে। এছাড়া পাঁচতলা করে একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী হল ভবন, একটি ডরমেটরি ভবন, নলকূপ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, প্রবেশ গেট, ভূমি উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক সাব স্টেশনসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ স্থাপন প্রকল্পের আওতায় প্রায় দুই হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী নিয়ে প্রায় ১০টি বিভাগ খোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একাডেমিক ও প্রশাসনিক অবকাঠমো পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে ৪০টি বিভাগ ও তিনটি ইনস্টিটিউটে মোট সাত হাজার শিক্ষার্থীর সুযোগ সৃষ্টির কথা। এজন্য সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া মৌজায় ১০০ একর অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন। কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারির অন্তর্গত জমিতেই বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করা হবে। এক্ষেত্রে মোট এক হাজার ৩০০ একর জমির মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে ১০০ একর জমির ওপর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম