বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পলায়নপরতা
এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধ করা জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষে দেশে এসে শিক্ষকতার মানোন্নয়ন করবেন-মূলত এই প্রত্যাশায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছর শিক্ষকদের মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা প্রদানপূর্বক শিক্ষাছুটি দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ডিগ্রি অর্জনের পর দেশের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষা না করে বহু শিক্ষক বিদেশেই স্থায়ী হচ্ছেন।
বছরের পর বছর পার হলেও শিক্ষাছুটিতে যাওয়া কয়েকশ শিক্ষক আর কর্মস্থলে ফিরছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চুয়েট, নোবিপ্রবি, কুবিসহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই ব্যাধি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
শিক্ষাছুটির নামে বিদেশে গিয়ে ‘লাপাত্তা’ হওয়া বা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এ প্রবণতা কেবল একজন শিক্ষকের পেশাগত অনৈতিকতার পরিচায়ক নয়, বরং এটি সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত। শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠদান ব্যাহত হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মেয়াদে সেশনজটে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং নতুন মেধাবীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের পথ দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শিক্ষক পলায়ন প্রবণতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ছুটি নেওয়ার আগে শিক্ষকরা একটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামা বা বন্ডে স্বাক্ষর করেন যে, তারা ছুটি শেষে দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেশকে সেবা দেবেন।
এই শর্তপূরণের প্রতিশ্রুতিতেই তারা নিয়মিত পান ছুটিজনিত বেতন, ভাতা ও বোনাস। অথচ এক দশক কিংবা দেড় দশক পার হলেও এসব অর্থ ফেরানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। জানা যায়, এসব শিক্ষকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাওনা অর্থ ইতোমধ্যে শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর উদাসীনতা, আইনি পদক্ষেপের শিথিলতা এবং সার্বিক সমন্বয়হীনতা এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওনার সঠিক কোনো হিসাব পর্যন্ত সংরক্ষিত নেই, যা প্রশাসনিক সক্ষমতার দৈন্যদশাই ফুটিয়ে তোলে।
ছুটি শেষে না ফেরার কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেবল নামকাওয়াস্তে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে, কিন্তু তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনছে না। শুধু চাকরিচ্যুত করলেই শতকোটি টাকার আর্থিক অপচয় ঢাকা পড়ে না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই তাদের প্রদত্ত অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের পূর্ণ হিসাব কষে বন্ডের শর্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার আগে বন্ডের আর্থিক নিশ্চয়তা বা জামানতের শর্ত আরও কঠিন ও বাস্তবসম্মত করা জরুরি, যেন কেউ বিদেশে স্থায়ী হওয়ার চিন্তা করার আগে সেই অর্থ পরিশোধে বাধ্য হন।
বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা রোধে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও আইনি পথ উন্মুক্ত করতে হবে। যারা শিক্ষা অর্জনের পর প্রতিশ্রুতির শর্ত ভঙ্গ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে, কোনো শিক্ষক যেন উচ্চশিক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করে বিশ্বমঞ্চে নিজ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে জনগণের করের টাকায়। তাই প্রশাসনিক উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে শিক্ষকদের এই ‘পলায়নবৃত্তি’ থামাতে কঠোর আইনি সংস্কার জরুরি।
