আ.লীগ আমলে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে লুটপাট
জবাবদিহির নামে এ কোন প্রহসন?
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শুক্রবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্প নিয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়মের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের বিষয় নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর অবিচারও বটে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যের চারাগাছ লাখ টাকায় কেনা, পুরোনো জলাশয়কে নতুন পুকুর দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা পকেটে পোরা কিংবা কেবল আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটতেই ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডে’র কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। একের পর এক মেগা প্রকল্পে যখন এমন হরিলুট চলে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, প্রশাসনিক নজরদারি ও কঠোর শাস্তির অভাবে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ঠিক কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বলা বাহুল্য, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে নীতিমালার ভেতরে থেকে ব্যয়ের কিছু পরিবর্তন বা ভেরিয়েশন হতেই পারে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ব্যতিরেকে নির্ধারিত সীমার বহুগুণ অর্থ ছাড় করা এবং পরবর্তীকালে ‘পোস্ট-ফ্যাক্টো’ বা পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের জন্য পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে তা বৈধ করার মানসিকতা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের ওপর এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন চাপ সৃষ্টি করে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, এ ধরনের অনিয়মকে যদি নীতিগত নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে পরবর্তীকালে নিয়মিত বা বৈধ করে দেওয়া হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে সব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যই এক বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ নজির স্থাপন করবে। আমরাও মনে করি, অনিয়মকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে ফেলে। উদ্বেগের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সরষের ভেতরেই যদি ভূত বসে থাকে, তাহলে সেই তদন্ত থেকে আর যাই হোক, ন্যায়ের আশা করা বাতুলতা মাত্র।
ভুলে গেলে চলবে না, প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া আর অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আজ যদি উন্নয়ন স্থবির হয়ে যাওয়ার অজুহাত তুলে দুর্নীতির ফাইল চাপা দেওয়া হয়, তাহলে বুঝতে হবে-দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা জাতি করছে, সে গন্তব্য এখনো বহুদূরে। একটির অজুহাতে অন্যটিকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত অপরাধীদেরই সুরক্ষার পথ তৈরি করে দেয়। কাজেই এখন সময় এসেছে স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত একটি স্বাধীন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত প্যানেল গঠনের। অনুমোদনহীন অতিরিক্ত ব্যয়ের পোস্ট-ফ্যাক্টো বৈধতা দেওয়ার এই আত্মঘাতী প্রথা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আত্মসাৎ করা প্রতিটি পয়সা যেমন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা জরুরি, ঠিক তেমনি দেশি-বিদেশি পরামর্শক কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান-যাদেরই হাত থাকুক না কেন, সেই রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন আমরা অবশ্যই চাই; কিন্তু তার নামে জনগণের করের টাকায় যদি লুটের মহোৎসব চলে, তাহলে সেই তথাকথিত আধুনিকতার কোনো মূল্য থাকে না। শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের এই ভয়াবহ অনিয়মের সুরাহা করা না গেলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন ধারাবাহিক অপচয় কখনোই রোধ করা সম্ভব হবে না। সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
