হাসপাতালেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট
আলোর ঘরের আঁধার কাটাতে পদক্ষেপ কাম্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যে হাসপাতাল রোগীকে সুস্থ করে জীবনের আলো ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে, লোডশেডিংয়ের ফলে সেই প্রতিষ্ঠানের আঁধারে নিমজ্জিত থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিতাপের বিষয়, দেশের চলমান লোডশেডিংয়ের কবল থেকে হাসপাতালও রেহাই পাচ্ছে না। শনিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব হাসপাতালে লোডশেডিংয়ের ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জেনারেটর বা আইপিএসের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকায় অনেক সময় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) টর্চ বা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে সারতে হচ্ছে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার।
বলা বাহুল্য, আলো দিয়ে জীবন বাঁচানোর এ কেন্দ্রে যখন টর্চ কিংবা মোবাইল ফোনের আলোয় অস্ত্রোপচারের মতো স্পর্শকাতর কাজ চালাতে হয়, তখন তা শুধু অবকাঠামোগত ব্যর্থতা থাকে না, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্নেরও জন্ম দেয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রোগীদের যে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, এর গভীরতা পরিমাপ করা কঠিন। খবরে উঠে এসেছে, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র কিংবা নবজাতকদের ইউনিট তো বটেই, ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি প্রদানের স্পর্শকাতর যন্ত্রও লোডশেডিংয়ের কারণে একটানা বন্ধ থাকে। আঁধারের কবল থেকে মুক্ত নয় রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ, প্যাথলজি কিংবা জটিল ল্যাবরেটরিও। অথচ এ স্থানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসাসেবায় অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
এ সংকট কাটাতে তাই সাময়িক জোড়াতালিনির্ভর সমাধান নয়, চাই দ্রুত কার্যকর সমাধান। জানা যায়, অনেক হাসপাতালে ব্যাকআপ হিসাবে যে জেনারেটর রয়েছে, তা সচল রাখার জন্য জ্বালানি বাজেটের ঘাটতি একটি বড় বাধা। জীবন যেখানে মহামূল্যবান, সেখানে সীমিত বাজেটের দোহাই দিয়ে হাসপাতালগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঁধারে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কাজেই প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের জন্য জরুরি জ্বালানি বা বিকল্প বিদ্যুৎ তহবিলের বরাদ্দ কয়েকগুণ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা, যাতে বাজেটের অজুহাতে কোনো যন্ত্র বন্ধ না থাকে। একইসঙ্গে চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রকে সার্বক্ষণিক ‘জরুরি সেবা অঞ্চল’ হিসাবে ঘোষণা করাও দরকার। বিশেষ করে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শতভাগ ডেডিকেটেড বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎলাইন সরবরাহ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রান্তিক ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে যেখানে এখনো আধুনিক অবকাঠামো পৌঁছায়নি, সেখানে স্থায়ী সমাধান হিসাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংযোগ জোরদার করা কার্যকর সমাধান হতে পারে। এর ফলে হাসপাতালের ছাদে বা ফাঁকা জায়গায় সোলার প্যানেল স্থাপন করে আইসিইউ, ওটি এবং ইমার্জেন্সির মতো জরুরি ইউনিটগুলোকে মূল গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি, পিডব্লিউডি ও স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়ে প্রতিটি হাসপাতালের এটিএস, আইপিএস ও জেনারেটরগুলোর সাপ্তাহিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যেন সংকটের মুহূর্তে ব্যাকআপ ব্যবস্থা অকেজো না থাকে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাময়িক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি একটি জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যা কোনো পরিস্থিতিতেই হাসপাতালকে আঁধারে নিমজ্জিত হতে দেবে না। স্বাস্থ্যসেবার আলোর ঘরগুলোতে যেন সেবার আঁধার নেমে না আসে, সে বিষয়ে সময় থাকতে সরকার সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
