স্বপ্নের প্রকল্পে লুটপাট
অনাচার রোধে চাই কঠোর জবাবদিহি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যে কোনো কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নদী, নালা ও খালের ভূমিকা প্রাণভোমরার মতো। শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে ফসল রক্ষা-এ উভয় ক্ষেত্রেই খালগুলো বিশাল ভূমিকা পালন করে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিতভাবেই একটি রূপান্তরমুখী এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। ইতঃপূর্বে ছয় মাসে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই স্বপ্নের প্রকল্প এখন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক চক্রান্তের কারণে গভীর বিতর্কের মুখে পড়েছে। যে প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো, তা এখন পরিণত হয়েছে অর্থ আত্মসাৎ ও লুটপাটের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে।
রোববার যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, প্রকল্পের অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ সরাসরি শ্রমিকের হস্তচালিত কোদাল-ঝুড়ির মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে, যেন গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়; কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ স্থানে শ্রমিকের পরিবর্তে হেভি এক্সকেভেটর বা ভেকু মেশিন ব্যবহার করে তড়িঘড়ি মাটি কাটা হয়েছে। এমনকি অসহায় নারীদের সহজ-সরলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে, আগাম চেকে স্বাক্ষর করিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন জালিয়াতি ঘটেছে। এর চেয়েও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোথাও খালের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও নথিপত্রে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, কোথাও আবার পাড়ের সামান্য আগাছা পরিষ্কার করেই পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। সাশ্রয় দেখানোর নামে সরকারি কোষাগারে অল্প টাকা ফেরত দিয়ে দুর্নীতির বিশাল ভাগবাঁটোয়ারা আড়ালের যে অপচেষ্টা চলছে, তা প্রশাসনিক চরম নৈতিক অবক্ষয়েরই শামিল।
নদী ও খাল কোনো বিচ্ছিন্ন জলাশয় নয়; এটি একটি বিশাল প্রাকৃতিক প্রতিবেশগত ব্যবস্থার অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমানা নির্ধারণ না করে অথবা মূল নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনর্প্রতিষ্ঠা না করে বিচ্ছিন্নভাবে মাটি কাটলে কাজের সুফল পাওয়া অসম্ভব। আমরাও মনে করি, রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার হিসাব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যদি সেটি জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা ও অনাচার বন্ধে সরকারকে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এজন্যে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ম্যাপ, ড্রোন জরিপ এবং জিআইএস ম্যাপিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ভুয়া স্থান ও অবাস্তব দৈর্ঘ্য দেখিয়ে বিল উত্তোলনের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়। এছাড়া, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি যেন সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। একইসঙ্গে একটি খাল বারবার খননের পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কিনা, তা যাচাইয়ে পূর্ববর্তী তদারকি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সর্বোপরি, পরিবেশবিদ ও স্থপতিদের পরামর্শে সমন্বিত নদী-খাল সংযোগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। সরকার এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
