সড়কে ই-রিকশার দৌরাত্ম্য, টেকসই সমাধানে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে স্বল্প দূরত্বের বাহন ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। কম শারীরিক পরিশ্রমে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এর চাহিদাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে কোনো ধরনের অনুমোদিত নকশা, আইনি নিবন্ধন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়া সড়কে নামা এই বাহনটি এখন নগরজীবনের জন্য এক তীব্র বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়ক, ব্যস্ত মোড়, এমনকি উড়ালসড়কও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই অনিয়ন্ত্রিত যান। ট্রাফিক আইন অমান্য করা, অনভিজ্ঞ চালকের বেপরোয়া গতি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং ভুল লেনে গাড়ি চালানোর কারণে রাজধানীজুড়ে যেমন স্থবির হয়ে পড়ছে সড়ক যোগাযোগ, তেমনি প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
পরিতাপের বিষয়, সরকারি কোনো সংস্থার কাছেই বর্তমানে ই-রিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, কেবল রাজধানীতেই এ সংখ্যা ইতোমধ্যে ১২ লাখ অতিক্রম করেছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন যান যুক্ত হচ্ছে। গত দেড় দশকে একাধিক নিষেধাজ্ঞা, উচ্ছেদ অভিযান বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল প্রয়োগের কারণে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হতে দেখা যায়নি। ফলে বৈধ ব্যবস্থার বাইরে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী ও সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
বিভিন্ন সময় রাজপথের অভিযানে ই-রিকশা ডাম্পিং কিংবা চালকদের আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি করা হলেও অবৈধ রিকশা প্রস্তুতকারক, গ্যারেজ মালিক ও নেপথ্যের বিত্তশালী বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে গণপরিবহণের সংকট, ফুটপাতের অচলাবস্থা এবং বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সুযোগে এর ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় সমস্যাটি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। আশার কথা, সম্প্রতি সরকার আধুনিক নীতিমালার মাধ্যমে ই-রিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ বা জোড়াতালির পরিকল্পনায় এ সংকট নিরসন করা কঠিন। পর্যাপ্ত প্রশাসনিক সমন্বয় এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে হকার উচ্ছেদের মতো এই নীতিমালাও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই হুটহাট উচ্ছেদ বা ঢালাও নিষেধাজ্ঞার পথ পরিহার করে সড়ক নিরাপত্তা ও জনভোগান্তি নিরসনে সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, এ জটিলতা দূরীকরণে চালকদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা দরকার। লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের রুটিরুজি যেখানে সরাসরি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে হুট করে সব বন্ধ করে দিলে তা নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে। কাজেই সমস্যা সমাধানে চালকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিবন্ধিত অন্যান্য বাহনে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একইসঙ্গে মানুষকে স্বল্প দূরত্বে হাঁটার সুযোগ দিতে ফুটপাতগুলোকে দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে, সাইকেল চলাচলের উপযোগী পরিবেশ গড়তে হবে এবং ঢাকা ও অন্যান্য শহরে নিরাপদ ও উন্নতমানের বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে ই-রিকশার বিপজ্জনক চলাচল বন্ধে সরকার একটি সমন্বিত, নিরাপদ ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জোরালো পদক্ষেপ নেবে-এটাই প্রত্যাশা।
