লাগামহীন দ্রব্যমূল্য
বাজার তদারকি জোরদার হবে কবে?
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিত্যপণ্যের, বিশেষত খাদ্যপণ্যের বাজারের তীব্র উত্তাপ দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও শাকসবজির উর্ধ্বমুখী দামের ধাক্কায় সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই নিত্যব্যবহার্য পণ্যেরও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের ওপর চাপিয়েছে এক নতুন বোঝা।
বেঁচে থাকার তাগিদে খাদ্যদ্রব্য কেনা যতটা অপরিহার্য, ঠিক ততটাই প্রয়োজন দৈনন্দিন গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখার জন্য সাবান, টুথপেস্ট, ডিটারজেন্ট, শেভিং রেজার কিংবা সাধারণ নারিকেল তেলের মতো সামগ্রীগুলোও। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাদ যাচ্ছে না এসব দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যসামগ্রীও। শুক্রবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে-কীভাবে নিত্যব্যবহার্য সব পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিগত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, করোনা-পরবর্তী কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং পরিবহণ ও বিদ্যুতের বর্ধিত খরচ উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সেই অজুহাতকে পুঁজি করে বাজারব্যবস্থার ভেতরে যে অনৈতিক মুনাফাখোর সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা স্পষ্টতই এক ধরনের নীতিহীন চক্র। তাই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম সামান্য বাড়লে বা উৎপাদন খরচ সামান্য বৃদ্ধি পেলেই স্থানীয় খুচরা বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বলা বাহুল্য, ব্যবসায়ীদের এই অসংযত মুনাফালোভ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন আরও কোণঠাসা করে ফেলছে।
সংসারের নির্দিষ্ট কিংবা সীমিত আয় দিয়ে মাস চালানো এখন মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তের জন্য এক বিরাট সংগ্রাম। মাসের প্রথম কয়েক দিনেই বেতনের বড় অংশ নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোতেও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পুষ্টিকর খাবার তো বাদ পড়ছেই, বাদ পড়ছে পছন্দের সাধারণ বিনোদনটুকুও। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবনযাত্রার সামগ্রিক মানের এই আশঙ্কাজনক অবনতি কোনো সুসংগঠিত সমাজ ও অর্থনীতির সুস্থতার লক্ষণ হতে পারে না।
এ দুর্দশা থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে হলে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভুল ব্যাখ্যা বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করি আমরা। ‘মুক্তবাজার’ মানেই যে যার মতো দাম হাঁকিয়ে অন্যায্য লাভ করবে-এমনটা হতে পারে না। সরকারের উপযুক্ত তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকর উপস্থিতির মাধ্যমেই কেবল মুক্তবাজার তার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। এজন্য সরকারের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য তদারকি সংস্থার দৃশ্যমান, কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন অভিযান থাকা প্রয়োজন। কেবল জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; অনিয়ম ও অন্যায্য মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন খরচ এবং যৌক্তিক লাভ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলাও এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের পকেটে আর কতটা চাপ সহ্য করার ক্ষমতা আছে, সেটা নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। কেবল নীরব দর্শক হয়ে না থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের মুখে স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে আনবে সরকার, এটাই প্রত্যাশা।
