অশুভ চক্রে এলএনজি খাত
টেকসই বিকল্প ও সংস্কার জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমদানিকৃত এলএনজির বাজার যখন গুটিকতেক সিন্ডিকেটের কবজায় চলে যায়, তখন এর সার্বিক খেসারত দিতে হয় দেশের পুরো অর্থনীতি ও জনগণকে। রোববার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গত ছয় মাসে স্পট মার্কেট থেকে কেনা ৩৪ কার্গো এলএনজির মধ্যে ৩১টিই মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এমন ঘটনা কেবল বাজার ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে না, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। আন্তর্জাতিক সূচকের চেয়ে ইউনিটপ্রতি বাড়তি দাম ধরে সরকারি অর্থ গচ্চা দেওয়ার এই প্রবণতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের এই সংবেদনশীল সময়ে প্রতি কার্গোতে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ অপচয় করা রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট বোঝার শামিল।
আমরা মনে করি, এই একচেটিয়া পরিস্থিতির নেপথ্যে পেট্রোবাংলার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ার ঘাটতি অনেকাংশে দায়ী। তালিকায় বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকা সত্ত্বেও মাত্র অল্প কয়েকটি কোম্পানির দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রমাণ করে, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিদ্যমান নেই। পূর্বে কার্গো সরবরাহ করে সময়মতো বিল না পাওয়ার তেতো অভিজ্ঞতা অনেক সক্ষম ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, সীমিত কয়েকটি চক্র এই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করছে এবং জেকেএম সূচকের চেয়ে বহুগুণ চড়া দাম হেঁকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘনঘন পরিবর্তনের মুখে কেবল স্পট মার্কেটের অনিশ্চিত দরপত্রের ওপর নির্ভর করে পুরো দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মঘাতী। ফলে বিদ্যমান এই ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারকে অবিলম্বে ক্রয়ের পদ্ধতিতে কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। সেক্ষেত্রে অনিশ্চিত ও প্রতিযোগিতাহীন স্পট মার্কেটের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। যখন বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়বে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক দর কমে আসবে এবং সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাব দূর হবে।
দেশে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য এলএনজির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না থেকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় গ্রিডে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যেন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি দরকার। আমদানিকৃত এলএনজি টার্মিনালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা দক্ষতাও সুনিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো টার্মিনালের সামান্য দুর্ঘটনায় পুরো দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মাসের পর মাস স্থবির হয়ে না পড়ে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসাধু চক্রের যোগসাজশ ভেঙে যদি জ্বালানি খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কেবল বাড়তেই থাকবে, যার চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত চুকাতে হবে নাগরিকদের।
