জনগণের চাপ বাড়ছেই
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সঠিক পদক্ষেপ কাম্য
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অস্বস্তি ডেকে এনেছে। দিনের পর দিন চুলায় গ্যাস না থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং জ্বালানির অভাবে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এ পরিস্থিতি শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেই বিপর্যস্ত করেনি, বরং দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ধারাকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতীয় জীবনের এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এই জটিল পরিস্থিতির উৎস চিহ্নিত করে এর টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা তাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বস্তুত এ পরিস্থিতির পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হয়ে ওঠে-বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবই আজকের এই মহাবিপত্তির প্রধান অনুঘটক। পতিত সরকারের আমলে নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে অবহেলা করে জ্বালানি খাতকে চরম আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছিল। চাহিদা ও সরবরাহের বাস্তব হিসাব না করে দুর্নীতির সুযোগ রেখে কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যবসায়িক স্বার্থে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, অথচ সেগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের স্থায়ী কোনো বন্দোবস্ত করা হয়নি। কুইক রেন্টালের মতো অস্থায়ী ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পেছনে বিপুল অর্থ ঢালা হলেও দেশের ভেতরের সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রগুলো অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর ওপর ডলার-সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অগ্নিমূল্য যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর অবকাঠামোর সামান্যতম যান্ত্রিক ত্রুটি পুরো দেশকে অন্ধকারে তলিয়ে দেওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি করেছে, তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত জ্বালানি নীতিরই পরিণতি।
বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকারের ওপর এই সংকট সমাধানের এক বিশাল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া এ পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়-এই বাস্তব সত্য স্বীকার করেও বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া কেবল দুঃখ প্রকাশ করে বা কুইক রেন্টাল চালু করে স্থায়ী মুক্তি আসবে না। এখন প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত নিজস্ব দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা। স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে আটকে থাকা বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাফল্য পেয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও নদীর অববাহিকা এবং শিল্পকারখানার অব্যবহৃত ছাদগুলোকে সৌর প্যানেলের আওতায় আনার জাতীয় রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে অপচয় বন্ধ করে জ্বালানির সুষম ও দক্ষতাভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করি আমরা। স্বল্পমেয়াদে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক সহনীয় চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংগ্রহের কূটনীতি জোরদার করতে হবে। সরকার যদি সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে সাময়িক এই অন্ধকার কাটিয়ে দেশ আবারও টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে ফিরে আসতে সক্ষম হবে।
