জুলাইয়ের গণহত্যাকারীদের বিচার
ন্যায় প্রতিষ্ঠার আরেকটি মাইলফলক
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন, তা ছিল প্রত্যাশিত। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায় কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বীকৃতিও বটে। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন-কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। দণ্ডপ্রাপ্ত এ সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
রায়ে সাদ্দাম ও ইনান ছাড়া ওবায়দুল কাদেরসহ বাকি পাঁচ আসামির অর্ধেক সম্পদ জব্দ করে আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এটি এ রায়ের একটি বিশেষ ইতিবাচক দিক বলে মনে করি আমরা। কারণ এর মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি ট্রাইব্যুনালের গভীর সংবেদনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকালের ঘটনায় ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলন দমনের নির্দেশ, অপহরণ ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। অভিযোগগুলোর একটি হলো, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে তার সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মোবাইল ফোনে কথোপকথনে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে যে, তার এই নির্দেশের পর ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা সারা দেশে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গণহত্যা চালায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বার্তাটি হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বিচারে মানুষ হত্যার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হওয়া দরকার। আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থেকে বিচার প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আইন তার নিজস্ব গতিতে চলেছে এবং যথাযথ স্বচ্ছতার সঙ্গেই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে। তাই এই রায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বলিষ্ঠ বার্তা।
তবে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কিছু মহলের নেতিবাচক তৎপরতা এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো যে বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটেছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। রায় ঘোষণার পরপরই সুপ্রিমকোর্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা প্রমাণ করে, অপরাধীদের দোসররা এখনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের উসকানি ও নাশকতার বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে রায়ের সঠিক বাস্তবায়ন হয় এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।
পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার মাধ্যমেই কেবল ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ হতে পারে। ঐতিহাসিক এই রায় ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় রাখবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়-এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
