রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা
হঠাৎ ‘পোষ্য কোটা’র সিদ্ধান্তে নানা প্রশ্ন
Advertisement
কাজী জেবেল ও ইরফান তামিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের মাত্র সাত দিন আগে ‘পোষ্য কোটা’ বাস্তবায়নে হঠাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ৬২ সন্তানকে পোষ্য কোটায় ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয় ভর্তি কমিটি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নির্বাচন সামনে রেখে পোষ্য কোটা কার্যকরের কৌশল নেওয়া হয়েছে নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। এ কোটা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় কর্মসূচি পালন নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি শিক্ষক এবং কর্মকর্তারা বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছেন। পোষ্য কোটা নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রমেও রাকসু নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি ভোটের নতুন তারিখ ১৬ অক্টোবরে ভোটগ্রহণ হবে কি না, এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে পোষ্য কোটা কার্যকরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এ ঘটনায় শিক্ষক লাঞ্ছনা এবং এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিচার না হওয়ায় ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বিরাজ করছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম এবং বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠন। এতে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা এ কর্মসূচির সঙ্গে না থাকলেও তারা মঙ্গলবার ক্লাসে যাননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গতকাল প্রশাসন উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। ফলে ক্যাম্পাস অনেকটা ফাঁকা।
পোষ্য কোটা ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মুখোমুখি অবস্থানে ছাত্র সংগঠনগুলো। কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবি ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্য সংগঠনগুলোর। কমপ্লিট শাটডাউনের প্রতিবাদে আজ মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। মঙ্গলবার ছাত্রদল ক্যাম্পাসে নেতাকর্মীদের নিয়ে মিটিং করলেও কোনো মিছিল-সমাবেশ করেনি। ছাত্র সংগঠনগুলো বিরোধিতা করলেও সন্তান ভর্তির সুযোগকে ন্যায্য অধিকার বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাদের মতে, চলতি শিক্ষাবর্ষে মেধা কোটায় নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির পর অতিরিক্ত ৬২ জনকে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে অটল অবস্থানে রয়েছেন তারা। এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান চলতে থাকলে ১৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাবি প্রশাসন ও রাকসু নির্বাচন কমিশনের একাধিক সদস্য। তারা যুগান্তরকে জানান, সামনে পূজার ছুটির কারণে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করায় পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৫ অক্টোবর ক্যাম্পাস খোলার পর পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।
জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ভর্তি কমিটিতে ডিন, সব বিভাগের সভাপতি ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকরা আছেন। তারা সন্তানদের ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেহেতু ইতোমধ্যে ক্লাস শুরু হয়েছে, তাই শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান ভর্তির একটা চাপ ছিল। সেই কারণে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সন্তান ভর্তির এ সিদ্ধান্ত অনেকেই মেনে নেয়নি। সুতরাং দুই পক্ষের দাবির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এক ধরনের সমস্যা তো থাকবেই, যার প্রভাব (১৬ অক্টোবরের) ভোটে পড়তে পারে। তিনি বলেন, অনেস্টলি বললে, আমাদের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই ভোটগ্রহণ করবে। এখন ওনারা সহযোগিতা না করলে যে কোনো সময় এটা (নির্বাচন) অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।
দ্রুত পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমরা আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের আপিল রেখেছি, যত দ্রুত সম্ভব আমরা পাঠদানে যেন ফিরে আসি। কারণ, দিনশেষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের সবার। তারা নিজেরা মিটিং করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।
তিন দফায় নির্বাচনের তারিখ পেছানোয় অনেক ধরনের প্রশ্ন উঠছে বলে স্বীকার করেছেন রাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রফেসর ড. এফ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নির্বাচন পিছিয়ে ১৬ অক্টোবর নেওয়ার ঘোষণার পরই অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে আমরা স্বাভাবিকভাবে বিব্রত হচ্ছি। কারণ, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে আমরা নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করেছি; কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচনটা করতে পারিনি। বারবার নির্বাচনের তফশিল পরিবর্তন করতে হয়েছে। এর জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী নয়। বিভিন্ন পক্ষের দাবি মানতে গিয়ে আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় বিচার না হওয়া পর্যন্ত অনেক শিক্ষক নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষকের (প্রো-ভিসি অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন) গায়ে হাত তোলা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষক মর্মাহত। তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি পক্ষ শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছে। আমি নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলাম। সেখানে এক-তৃতীয়াংশ যোগ দিয়েছেন। বাকিরা জানিয়েছেন, ওই ঘটনার বিহিত না হওয়া পর্যন্ত তারা নির্বাচন কন্ডাক্ট করবেন না।
তিনবার পিছিয়েছে নির্বাচন : রাবি প্রশাসন, শিক্ষক ও কয়েক ছাত্র সংগঠনের অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নানা অজুহাতে এ পর্যন্ত তিনবার নির্বাচন পেছানো হয়েছে। প্রথমে ১৫ সেপ্টেম্বর, এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ২৫ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল। এখন তা পিছিয়ে ১৬ অক্টোবর নেওয়া হয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, প্রথম তফশিলে ১৫ সেপ্টেম্বর ভোট হওয়ার কথা ছিল। ওই সময় নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বাড়তি সময় চায় ছাত্রদল। ছাত্র অধিকার পরিষদ ও বামপন্থী সংগঠনগুলো হল থেকে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন এবং ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের দাবি জানায়। তাদের ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ২৮ সেপ্টেম্বর ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পুঁজার বন্ধ শুরু হওয়ার তারিখ থাকায় শিক্ষার্থীরা ভোট এগিয়ে আনার দাবি জানান। ওইদিনই ২৫ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়। এরই মধ্যে পোষ্য কোটা ইস্যুতে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। এতে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা এবং অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ায় আবারও ভোটের তারিখ পেছানোর দাবি জানায় ছাত্রদলসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভোটের তারিখ ১৬ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সেতাউর রহমান বলেন, কোনো না কোনো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন তারিখে নির্বাচন নিয়ে এখনো সংশয় দেখছি না। তবে ছুটি শেষ হওয়ার পর ক্যাম্পাস খুললে তখন পরিস্থিতি বোঝা যাবে।
নির্বাচন পেছানো নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য : নির্বাচনে ভোটগ্রহণের তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবর পরিবর্তনের বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো একে অপরকে দায়ী করছে। একটি পক্ষ দাবি করেছে, নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ এবং ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কয়েকজন নেতা আকস্মিকভাবে পোষ্য কোটা সামনে নিয়ে এসেছেন।
এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরকে দায়ী করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী। তিনি বলেন, এই সংকট তৈরি করেছে প্রশাসন। আর প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রশিবির। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রফেসর ড. এফ নজরুল ইসলাম একজন জামায়াতপন্থি শিক্ষক। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের নেতা ছিলেন। ছাত্রশিবিরের চাওয়া অনুযায়ী তিনি বারবার ভোট পেছাচ্ছেন। পোষ্য কোটার বিষয়ে এ ছাত্রনেতা বলেন, এটা রাজনৈতি ইস্যু নয়, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়।
এ অভিযোগের বিষয়ে প্রফেসর ড. এফ নজরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাত সদস্যের মধ্যে ৫ জন বিএনপি ও দুজন জামায়াতপন্থি। তবে আমরা কেউ কোনো দলের পক্ষে-বিপক্ষে নই। আমরা নিরপেক্ষভাবে একসঙ্গে কাজ করছি।
নির্বাচন বারবার পেছানোর জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন রাবি ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল। তিনি বলেন, নির্বাচন পেছানোর জন্য বারবার পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। পোষ্য কোটা বাতিল এই ইস্যু অনেক আগেই মীমাংসিত। নির্বাচন বানচাল করতে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকরা এটিকে আবারও সামনে এনেছেন। এমনকি আগামী ১৬ অক্টোবর ভোটের আগেও নতুন ইস্যু সামনে আনা হবে বলে মনে করেন তিনি।
এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচার দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। প্রশাসনকে দায়ীদের বিচার করতে হবে। কোটার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার। অন্য তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ অধিকার রয়েছে।
শিক্ষক লাঞ্ছনার ভিডিও ফুটেজে আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেলের জিএস প্রার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্বারকে দেখা যায়। তিনি দাবি করেন নির্বাচন পেছাতে কোটা ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসন সঠতার আশ্রয় নিয়েছে। আমরা নামে বা বেনামে পোষ্য কোটা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে দেব না।
