শাহজালালে কার্গো ভিলেজ পুড়ে ছাই
এবার আগুন বিমানবন্দরে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আগুনে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে আমদানিকৃত পণ্য মজুতের গোডাউন কার্গো ভিলেজ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিমানবন্দরের এই আগুনের ঘটনাকে কেউ স্বাভাবিকভাবে দেখছে না। এর পেছনে কোনো নাশকতা আছে কি না বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষের চক্রান্ত কি না, তা নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা চলছে। এর কারণ হচ্ছে, গত ৫ দিনের ব্যবধানে পরপর তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কেন ঘটেছে, তার রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। ফলে কেপিআইভুক্ত স্পর্শকাতর বিমানবন্দর এলাকায় আগুনের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণ বিশ্বাস করে এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। রাত ১০টার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রি. জেনারেল জাহেদ কামাল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ঘাটতির প্রতি ইঙ্গিত করেন।
সূত্রগুলো জানায়, শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের (আমদানিকৃত পণ্য মজুত স্থান) কুরিয়ার গোডাউনে আগুনের সূত্রপাত হয়। নিমিষেই আগুন পৌঁছে যায় ইলেকট্রনিক্স গোডাউনে। আগুন কেমিক্যাল গোডাউনে গেলে তা প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিমানবন্দরের পুরো আমদানি কার্গো ভিলেজে। কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আকাশ। আগুন নেভাতে উন্নত প্রযুক্তি রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং রোবট ব্যবহার করা হয়। হঠাৎ এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিমানবন্দরের সব ধরনের ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনাসহ জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আগুনে ফায়ার ফাইটার ও আনসার সদস্যরা আহত হন। এদের মধ্যে ২৫ জনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে বিপুল পরিমাণ মালামাল। প্রাথমিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে। রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে জানানো হয়, আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। রাত ৯টা ১৮ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট ওঠানামা পুনরায় শুরু হয়। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা একটা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি। সবাই মিলে এই সমস্যা উত্তরণের চেষ্টা করছি।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঘটনার পরপরই বিমানবন্দরের ফায়ার সেকশন, বিমানবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী সম্মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম শুরু করে। খবর পেয়ে বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট বিমানবন্দরে যায়। এরপর আশপাশের ১৩টি ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট একে একে আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। এছাড়া সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণসহ ঘটনাস্থলের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হওয়ায় যেসব ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কথা ছিল, সেসব ফ্লাইট কলকাতা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের জনান, আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি শুধু আমদানি কার্গো শাখায় সীমাবদ্ধ ছিল। রপ্তানি কার্গো নিরাপদ রয়েছে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব বিমানবন্দরের ফ্লাইট ও কার্গো কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। দুর্ঘটনার কারণে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে বলে তিনি জানান। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিয়া) শাহজাহান শিকদার জানান, এখন শুষ্ক মৌসুম। বছরের এই সময়ে সাধারণত আগুন বেশি লাগে। সম্প্রতি যে কয়টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এর কোনোটিতেই আমরা নাশকতার আলামত পাইনি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কাজ করে এভিয়েশন ফায়ার সার্ভিস। তাই সেখানে পূর্ব থেকে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই। তাই ঘটনাস্থলটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কি না, সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়। শনিবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ফলে আশপাশে দীর্ঘ এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উত্তরায় অতিরিক্ত ৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মহিদুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কার্ডধারী ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আমরা পুরো এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছি, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। এছাড়া উত্তরা বিভাগের ছয়টি থানার পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরাও সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাকি ট্রান্সপোর্টের কর্মী মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন রাব্বি জানান, আজ (শনিবার) আমাদের কিছু মালামাল বের হওয়ার কথা ছিল। আমার ভাই ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে ফোন করে আগুনের খবর দেন। ওই সময় খুব সামান্য আগুন ছিল এবং তখন ফায়ার সার্ভিসের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না, শুধু আনসার বাহিনী ছিল। আধা ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে দেখি আগুন কেমিক্যালের গোডাউনে ছড়িয়ে পড়েছে। যার কারণে প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। সেখানে প্রচুর পরিমাণ কেমিক্যাল মজুত ছিল। একই ধরনের তথ্য জানান সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পারভেজ শেখ।
মনিরুজ্জামান নামের এক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী বলেন, আমি তিনটি সিফটে ইন্ডাস্ট্রিয়াল মালামাল এনেছি। ৭৯ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সবই পুড়ে গেছে। এগুলো ছিল আইসক্রিমের ফ্লেবার। তার ধারণা, কুরিয়ার গোডাউনের স্কাইপো ইন্টারন্যাশনালের এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুন লেগেছে।
আব্দুর রহমান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেন, শুরুতে আগুন কম ছিল। বিমানবন্দরে থাকা ফায়ার স্টেশনের সদস্যদের কাজ করতে দেখা যায়নি। বাইরে থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আসে বেশ কিছু সময় পর। কিন্তু তারা এসে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করতেই গোডাউনের কেমিক্যালে আগুন ধরে যায়। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিকাল সাড়ে ৩টায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওসার মাহমুদ জানান, ‘বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।’ এরপর ঢাকাগামী বেশ কয়েকটি ফ্লাইটকে বিকল্প রুটে পাঠানো হয়। এদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও ট্যাক্সিওয়েতে আটকে রাখা হয়।
এদিকে ভয়াবহ এই আগুনের ঘটনায় নিকুঞ্জ থেকে বিমানবন্দরমুখী সড়কে ব্যাপক জট তৈরি হয়। এ কারণে ৪ কিলোমিটার এই পথ পাড়ি দিতে দীর্ঘ সময় লাগে যানবাহনগুলোর। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। এ বিষয়ে ডিএমপি ট্রাফিক উত্তরা বিভাগের বিমানবন্দর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার এসএম হাসিবুর রহমান বাবু জানান, বিমানবন্দরে আগুন লাগার কারণে এই সড়কে গাড়ির জট তৈরি হয়েছে। আগুন লাগার কারণে বিমানবন্দর এলাকায় গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যেসব গাড়ি বিমানবন্দরে ঢুকতে চাচ্ছে, সেসব গাড়ির মালামাল ও যাত্রীদের প্রধান সড়কে নামতে হচ্ছে। এতে এই সড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তাহলা বিন জসিম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং রোবট ব্যবহার করা করা হয়েছে। এটি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। দ্রুত আগুন যেন নিয়ন্ত্রণে আসে, সেজন্য এই রোবট ব্যবহার করা হয়। তিনি আরও জানান, কারখানা, গুদাম বা তেল-গ্যাস স্থাপনার আগুন নেভানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানে ফায়ার ফাইটারদের পক্ষে সরাসরি প্রবেশ করা বিপজ্জনক। এজন্য রোবট ব্যবহার করা হয়। এটি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালানো হয়। এর শক্তিশালী ফ্যান ও পানির জেট দিয়ে এটি আগুন নিয়ন্ত্রণে এবং ধোঁয়া ও গরম বাতাস দূর করতে সাহায্য করে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, বিমানবন্দরের ইমপোর্ট কার্গো এলাকার ৮ নম্বর গেটের পাশে বিভিন্ন কোম্পানির আমদানিকৃত কেমিক্যাল, গার্মেন্ট, ইলেকট্রনিকস ও মেশিনারিজ পণ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রায় এক হাজার আনসার সদস্য ঘটনাস্থলে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন। এ সময় কর্তব্যরত অবস্থায় ১৫ জন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের সিএমএইচ ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যান। এ সময় বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আনসার ও ভিডিপির গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. আশিকুজ্জামান জানান, এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আনসার ও ভিডিপির এক হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আটজনকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি সাতজনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আনসার বাহিনীর উত্তর জোন কমান্ডার মো. গোলাম মৌলাহ তুহিন জানান, আনসার সদস্যরা অগ্নিকাণ্ডের শুরুতেই দেখতে পেয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সাহসিকতার সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শুধু কাঁচামাল পুড়ে যায়নি, অনেক এয়ার শিপমেন্ট শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। এই আর্থিক ক্ষতি কীভাবে পোষাবে, এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কিছু জানা যায়নি। তিনি আরও বলেন, পোশাকশিল্পের কত টাকার কাঁচামাল আগুনে পুড়েছে, তার হিসাব কষা হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম মিঠু যুগান্তরকে বলেন, আগুন লাগার এক ঘণ্টা পর সিভিল এভিয়েশন ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিতে চাইলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরাপত্তার কারণে কাউকে অংশ নিতে দেননি। কারণ কার্গো ভিলেজে অস্ত্র, গোলাবারুদ, রাসায়নিক দ্রব্য ও গার্মেন্ট পণ্য ছিল। তিনি আরও বলেন, কত কোটি টাকার পণ্য পুড়েছে, তা প্রাথমিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, এটা নিশ্চিত। কেননা বিমানে জরুরি ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করা হয়ে থাকে। কার্গো ভিলেজে মূল্যবান গুদামও রয়েছে। সেখানেও মূল্যবান পণ্য ছিল। বিমানবন্দরে কার্গো ব্যবস্থাপনা কবে চালু হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিকে আগুন লাগার পর ঢাকা কাস্টমস কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এনবিআর ও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরেও চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, কার্গো ভিলেজের অবকাঠামো অনেক পুরোনো। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখানে নেই।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বিমানের ফ্লাইট সেফটি চিফ। সদস্য হিসাবে থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বিমানের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট সেফটি অ্যান্ড কোয়ালিটি), চিফ ইঞ্জিনিয়ার (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স), উপমহাব্যবস্থাপক (সিকিউরিটি) ও উপমহাব্যবস্থাপক (কার্গো-রপ্তানি)। আর সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিমানের উপব্যবস্থাপককে (ইন্স্যুরেন্স)। কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সুপারিশমালা পেশ করতে হবে।
এদিকে প্রায় সাত ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণের আসার পর রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। তিনি বলেন, খোলা জায়গা ও বাতাসের প্রবল গতির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এ জায়গাটি পুরোপুরি খোলা ছিল এবং ভেতরে ছিল খোপ খোপ করে ভাগ করা। বেশির ভাগ পণ্যই দাহ্য পদার্থ ছিল। বাতাসের অক্সিজেনের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা একদিকে আগুন নেভালেও অন্যদিকে বাতাসের কারণে আবার জ্বলে উঠছিল।
জাহেদ কামাল বলেন, আগুন পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন নির্বাপণের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সব ফ্লাইট চালু আছে। আগুন নেভানোর সময় আমাদের দুজন ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন, এছাড়া আনসারের কয়েকজন সদস্যও প্রাথমিকভাবে আহত হয়েছেন বলে খবর পেয়েছি।
আগুনের উৎস সম্পর্কে ডিজি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা কিছু নীল ফ্রেম দেখেছি, তবে এটা কেমিক্যাল ছিল কি না, এখনই বলা সম্ভব নয়। নির্বাপণ শেষে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারব। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।
সম্প্রতি ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইনসপেকশন করে সতর্ক করি, লাইসেন্স না থাকলে তা বাতিলের সুপারিশ দিই। কিন্তু আইন প্রয়োগের দায়িত্ব অন্যান্য কর্তৃপক্ষের। সমন্বিত উদ্যোগ না হলে এমন দুর্ঘটনা রোধ কঠিন। ফায়ার সার্ভিস একা পারে না, সব সংস্থার যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
