সাবেক চেয়ারম্যানের প্রশ্ন
আগুনের ঘটনা বেবিচক কেন তদন্ত করছে না
Advertisement
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কেন অবহেলা করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ যাত্রী ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীসহ অনেকেই। সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, এতবড় ঘটনায় বেবিচক কেন এখন পর্যন্ত একটি তদন্ত কমিটি করতে পারল না।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বেবিচকের নীরবতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানবন্দরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যেহেতু বেবিচকের, তাই তাদের নিজস্ব একটি তদন্ত কমিটি করা উচিত ছিল। তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএও মনে করছে, আমদানি কার্গো এলাকাজুড়ে এমন ভয়াবহ ক্ষতির ঘটনায় সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অবহেলা স্পষ্ট।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিমান বাংলাদেশ কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে। তারা নিজে যদি তদন্ত কমিটি করে, সেটা নিরপেক্ষ হবে না। সিভিল এভিয়েশনকে তদন্ত করতে হবে। অন্যরা কমিটি করলেও সার্বিকভাবে সিভিল এভিয়েশনকেই নেতৃত্ব নিতে হবে। কারণ পুরো এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা ও রেসপন্স ব্যবস্থার তত্ত্বাবধান তাদেরই। তারা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারবে না। তিনি বলেন, সিভিল এভিয়েশনের ফায়ার সেফটি অডিট, রেসকিউ প্রস্তুতি, নিয়মিত এক্সারসাইজ সব কিছুই নথিভুক্ত থাকে। প্রতি বছর মহড়া হয়, কনটিনজেন্সি প্ল্যানও আছে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে কোন দুর্ঘটনায় কারা ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হবে বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আর্মি, হসপিটাল-সব কিছুই নির্ধারিত। তার পরও যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে কোথায় গ্যাপ হয়েছে, সেটা তদন্ত করে বের করতে হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি রোববার থেকে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। কমিটিকে আগামী ৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বিমানের ফ্লাইট সেফটি চিফ। সদস্য হিসাবে থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বিমানের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট সেফটি অ্যান্ড কোয়ালিটি), চিফ ইঞ্জিনিয়ার (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স), উপ-মহাব্যবস্থাপক (সিকিউরিটি) ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো-রপ্তানি)। আর সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিমানের উপ-ব্যবস্থাপককে (ইন্স্যুরেন্স)। কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ ও ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সুপারিশমালা পেশ করতে হবে। কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করি বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন দিতে পারব।
শনিবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশি-বিদেশি ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ সাত ঘণ্টা বন্ধ থাকায় শত শত যাত্রী দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরের ভেতরে আটকা পড়েন। রোববার দুপুর থেকে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও যাত্রীরা এখনো ফ্লাইট বিলম্ব ও সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন। শনিবার বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলো এদিন সকাল থেকে ছাড়তে শুরু করে। দিনের ফ্লাইটগুলো গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পিছিয়ে যাত্রা করেছে, আবার কিছু পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট আধা ঘণ্টা পর্যন্ত এগিয়ে আনা হয়েছে। যার ফলে বিদেশগামী ও ট্রানজিট যাত্রীরা পড়েছেন মারাত্মক দুর্ভোগে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাতের শিডিউলে থাকা বহু ফ্লাইট রোববার সকালে ছাড়তে হয়েছে। কিছু ফ্লাইটে বিলম্ব হয়েছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত, এমনকি রোববার সকালের নির্ধারিত ফ্লাইটগুলোও গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে উড্ডয়ন করেছে। দুবাইগামী ফ্লাইটের এক যাত্রী আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রাতের ফ্লাইট ছিল আমার, কিন্তু আগুন লাগার পর থেকে বিমানবন্দরের ভেতরে বসে আছি। হোটেলে নিয়ে রেখেছিল। এখন হোটেল থেকে এয়ারপোর্টে আসতে বলেছে। কখন ভেতরে ঢুকতে পারব বা ফ্লাইট কবে ছাড়বে কেউ ঠিক করে বলতে পারছে না।
রোববার ভোরে ঢাকা থেকে ১০ ঘণ্টা দেরিতে সিলেট পৌঁছালেন বাংলাদেশ বিমানের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ৬৫ জন যাত্রী। ওই বিমানের যাত্রী রাসেল আহমদ জানান, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে তারা ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তিনি জানান, সন্ধ্যা ৭টায় তাদের শিডিউল ফ্লাইট ছিল। কিন্তু, আগুন লাগার ফলে প্রথমে তাদের ফ্লাইটটি দুই ঘণ্টা বিলম্ব হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু, ফ্লাইটের জন্য তাদের ভোর ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ ফ্লাইটটি ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে ওসমানীতে অবতরণ করে।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, যাত্রীসাধারণের কষ্ট লাঘবে আমরা একটি অর্ডার ইস্যু করেছি। যার মাধ্যমে আগামী তিন দিন যত নন-শিডিউল ফ্লাইট আসবে, তার সব খরচ আমরা মওকুফ করে দেব।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিয়ে বেবিচক ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্যে ১৫ মিনিটের পার্থক্য দেখা গেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগুনের সূত্রপাত দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। তবে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তারা খবর পায় ২টা ৩০ মিনিটে এবং প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ২টা ৫০ মিনিটে। অর্থাৎ, আগুন লাগার অন্তত ৩৫ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থাপনার একটিতে এমন বিলম্ব কেন ঘটল, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
ঘটনাস্থলে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আরাফাত ইসলামের দাবি, আগুন লেগেছিল দুপুর ২টারও আগে। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগুনটা লেগেছিল কুরিয়ার গুদাম থেকে। সেখানে ২৫-৩০টি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কুরিয়ার সার্ভিসের আলাদা খোঁপ বা ‘খাঁচা’ আছে। লোকজন প্রথমে আগুন নেভাতে এগিয়ে গেলে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ। আগুন লাগার সময় তাদের একাধিক কর্মী সেখানে কাজ করছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, বেলা ২টার পরপরই অ্যালার্ম বেজে ওঠে। আমাদের কয়েকজন কর্মী দ্রুত কুরিয়ার গুদামে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন। তখনই বলা হয়, ভেতরে বিস্ফোরক বা অস্ত্র-গোলাবারুদ থাকতে পারে, সবাই দ্রুত সরে যান। আমরা তখন আর ঝুঁকি নিইনি। বেসামরিক বিমান পরিবহণ উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, অগ্নিনির্বাপণ কাজে বিলম্বের যে অভিযোগ আসছে তা আমলে নেওয়া হবে।

