দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ
ভারতের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান পররাষ্ট্র উপদেষ্টার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
তৌহিদ হোসেন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে একেবারে স্পর্শকাতর জায়গায় চরমপন্থি হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা কীভাবে আসতে পারল, তাদের সেখানে আসতে দেওয়া হয়েছে কেন-এই প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। এ ঘটনার পর থেকে দিল্লিতে নিয়োজিত বাংলাদেশের হাইকমিশনারের পরিবার ঝুঁকি অনুভব করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। শনিবার রাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে সংঘটিত বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় রোববার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে শনিবার রাতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র সেনা’র ব্যানারে বিক্ষোভ হয়েছে। এতে অংশ নেয় ২০-২৫ জন বিক্ষোভকারী। তারা প্রায় ২০ মিনিট ব্যানার নিয়ে বাংলাদেশ হাউজের সামনে অবস্থান করে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয়। বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যার ঘটনা এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে বিক্ষোভকারীরা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেয়।
এ ঘটনায় ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও অস্বস্তিকর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। পর্যবেক্ষক মহলের অনেকে এমনটি মনে করছেন। তারা বলেন, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলোকে কোনোভাবে বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না।
তবে বিষয়টিকে বাংলাদেশের কিছু মিডিয়ার বিভ্রান্তি ছড়ানো বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। রোববার তিনি গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য দেন। এমনকি তিনি এও বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
এদিকে ভারত সরকারের দেওয়া বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বক্তব্য দেন। গণমাধ্যমের সামনে ভারতের কাছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, দিল্লির সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে বিক্ষোভকারীরা কীভাবে প্রবেশ করল। এ সময় তিনি তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শনিবার রাতে ২০ থেকে ২৫ জন বিক্ষোভকারী চার থেকে পাঁচটি গাড়িতে এসে নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে বাংলাদেশ হাউজের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়। তারা সেখানে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেন। বিক্ষোভের সময় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশ হাউজের ভেতরে ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদ বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে তিনটি গাড়িতে করে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশ ভবনের গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করেন। তারা বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় ‘হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে’ এবং ‘হাইকমিশনারকে ধরো’-এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তিরা পরে মূল গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে চলে যান। তবে এ সময় তারা কোনো ধরনের শারীরিক হামলা চালাননি। কোনো কিছু ছোড়াছুড়িও করা হয়নি।
হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেস মিনিস্টার বলেন, হতে পারে। হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে তারা বলছিলেন, ‘ওখানে যদি হিন্দু মারা হয়, তাহলে আমরা তোমাদের সবাইকে মেরে ফেলব।’ তবে এগুলো ছিল কেবল কথাবার্তা ও চিৎকার। কোনো শারীরিক হামলা হয়নি।
ঘটনার পরপরই রাতে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডিফেন্স উইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। ডিফেন্স উইংয়ের এক কর্মকর্তা তাকে জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসে চিৎকার করে চলে গেছেন এবং বাড়তি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ‘বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা’ চালানোর অভিযোগ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোববার দিল্লিতে সাংবাদিকরা ভারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কাছে ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি তার এক্স হ্যান্ডেলে এমন মন্তব্য প্রকাশ করেন।
তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা আমরা দেখেছি। সত্যটা হচ্ছে, ২০ ডিসেম্বর ২০-২৫ জন যুবক নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছে এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির মতো কোনো প্রচেষ্টা সেখানে ছিল না।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জয়সওয়াল বলেন, কয়েক মিনিট পরই ওই দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনার ভিডিও প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশ মিশন বা কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির ওপর ভারত নজর রাখছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের জোরালো উদ্বেগ জানানো হয়েছে। আমরাও দীপু দাসের বর্বর হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।
নয়াদিল্লির বক্তব্য ঢাকার প্রত্যাখ্যান : নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার। রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতীয় প্রেসনোটে ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এটা সম্পূর্ণভাবে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি এজন্য যে, বিষয়টি যত সহজভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, বিষয়টি অত সহজ না।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে বাংলাদেশ মিশনের অবস্থান খুবই নিরাপদ স্থানে, সেখানে হিন্দু চরমপন্থিরা ওই এলাকার মধ্যে আসতে পারবে কেন? তাহলে তাদের আসতে দেওয়া হয়েছে-এমন ঘটনা প্রত্যাশিত নয়।
তৌহিদ হোসেন বলেন, তারা বলছে ২০-২৫ জনের দল। এমন একটা সেনসিটিভ এলাকার মধ্যে হিন্দু চরমপন্থি ২৫ বা ৩০ জনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন? তাহলে তাদের আসতে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তাদের আসতে পারার কথা না। তারপর তারা হিন্দু নাগরিককে হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে, তা কিন্তু নয়। আরও অনেক কিছু বলেছে, সেটা আমরা জানি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমার কাছে প্রমাণ নেই। কিন্তু আমরা শুনেছি যে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে এসে তাকে হুমকি দেবে কেন? এ ঘটনার পর থেকে দিল্লিতে হাইকমিশনারের পরিবার ঝুঁকিবোধ করছে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি, সাধারণ নিয়মে নিরাপত্তার বিষয়ে যে নিয়মকানুন আছে, সেটা এখানে পালিত হয়নি। তারা বলছে, আমাদের সব মিশনের নিরাপত্তা দেখছে, আমরা সেটা নোট করেছি।
হাইকমিশনে হামলা নিয়ে বাংলাদেশি গণমাধ্যমে সঠিক তথ্য এসেছে বলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, আমাদের গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন এসেছে, সেটাকে তারা বলছে ভুলভাবে উপস্থাপন, এটাও সত্য না। আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে।
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এটার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি একসঙ্গে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। যাকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং অবিলম্বে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু যে বাংলাদেশে ঘটে তা না, এ অঞ্চলের সব দেশে ঘটে এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব সেক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলাদেশ সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে।
