Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

সংকটাপন্ন টেক্সটাইল শিল্প আইসিইউতে

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংকটাপন্ন টেক্সটাইল শিল্প আইসিইউতে

Advertisement

নানা সংকটে দেশের টেক্সটাইল শিল্প আইসিইউতে। ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাসের অপর্যাপ্ততা, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, নগদ সহায়তা ও ইডিএফের (রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল) অপ্রতুলতা এ শিল্পকে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত আগ্রাসীভাবে কম মূল্যে সুতা ডাম্পিং করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ২০ মাসে ২৫০টি গার্মেন্ট ও ৫০টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে। মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। যার পুরোটাই সরকারের ব্যর্থতা। এ অবস্থায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোববার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের সভাপতিত্বে সভায় টেক্সটাইল মিল মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্যে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, চারদিকে শুধু সংকট আর সংকট-রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশের সংকট প্রভৃতি। এছাড়া ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস নেই এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি তো আছেই। এমনকি নগদ সহায়তা ও ইডিএফের আকারও কমিয়ে আনা হয়েছে। উপরন্তু, ভারত সুতা ডাম্পিং করছে। ২০ মাসে ভারতীয় সুতা আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৭ শতাংশ। প্রতি কেজি সুতায় ৩০ সেন্ট ডাম্পিং করায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ৫০টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব মিলে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০-৭০০ কোটি টাকা। ২ লাখ মানুষ কাজ করত। এ অবস্থায় নতুন করে এসব মিল চালু করা কঠিন। অথচ এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন, আমরা গ্যাসের ন্যায্যমূল্য চাই। বেশি দামে এলএনজি কেনা হলে দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কমলে দেশে কমানো হয় না কেন? আবার ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ছে। এদিকে কারও নজর নেই। শুধু মুখে বলা হয়-রপ্তানিমুখী শিল্প অর্থনীতির মেরুদণ্ড। অথচ মেরুদণ্ড তো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সুনজরে পড়ছে না। ভারত যেখানে একটা নীতি গ্রহণ করতে মাত্র ৩-৪ দিন সময় নেয়, সেখানে আমাদের বছর পার হয়ে যায়। শওকত আজিজ রাসেল বলেন, টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচানোর জন্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সরকারকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার ৫টি ফ্যাক্টরির মধ্যে একটি বন্ধ করে দিয়েছি। সরকারকে নোটিশও দিয়েছি। এরপর আমার নেক্সট প্ল্যান হচ্ছে পরেরটা কীভাবে বন্ধ করব? কারণ, একটা কারখানা বন্ধ করা অনেক কঠিন। ব্যাংকের টাকাপয়সা, শ্রমিকদের বেতন বুঝিয়ে দিয়ে তারপর বন্ধ করতে হয়।

সরকারের দায়িত্বহীনতার সমালোচনা করে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি। অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে মিটিং করা বা আমাদের পরামর্শ নেওয়ার মতো কোনো সময় তাদের নেই। অথচ এখন আমরা দেখি উপদেষ্টারা বড়-ছোট অনেক নেতার সঙ্গে মিটিং করছেন। তাদের অজস্র সময় দেন একটার পর আরেকটা মিটিং করার জন্য। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সার্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা খুবই চিন্তিত। সরকারের মনে রাখতে হবে-অদূরভবিষ্যতে এই সেক্টরকে বাঁচানো না গেলে অর্থনীতিতে ধস নামবে। অলরেডি বড় ধরনের ধস শুরু হয়ে গেছে।

স্বাগত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তি ও সামর্থ্য মেলানো সম্ভব নয়। তাই চাইলেও বাংলাদেশ ভারতের মতো শিল্পে সহায়তা দিতে পারবে না। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুততম সময়ে নজর দেওয়া যেতে পারে। যেমন: সুতায় ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া, কম হ্যান্ডলিং চার্জে ইডিএফ ফান্ড (রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল) ব্যবহার এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা ঋণের সুদ মওকুফ নয়, পুনঃতফসিল চাই। আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই। এখন মূলত মাটি কামড়ে পড়ে আছি। এভাবে যদি মিল বন্ধ হতে থাকে, সরকার তো টাকার উৎস বা নতুন করে ট্যাক্স বসানোর জায়গা পাবে না। বিনিয়োগ হলে সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স, অগ্রিম আয়কর এবং টার্নওভার ট্যাক্স পাবে। কিন্তু এখন তো বিনিয়োগ হচ্ছে না, বরং ক্রমেই কারখানা বন্ধ হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বন্ড সুবিধায় আনা সুতার বড় একটা অংশ সিরাজগঞ্জে তাঁতিদের কাছে চলে যায়। এক ধরনের ঘোষণা দিয়ে অন্য ধরনের সুতা আমদানি করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো সুতা সরবরাহ করতে পারছে না। বর্তমান স্পিনিং মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে আছে। স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি হলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতো।

ভারতীয় সুতার অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনবে বলে মনে করেন রাসেল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এবং আমদানি নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে চাই। ভারত একসময় বাংলাদেশে তুলা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েকদিন পরপর চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও পটোল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, এখন ভিসাও বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সময় আসবে সরকারের ভুল নীতির কারণে যখন বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, তখন ভারত সুতা রপ্তানিও বন্ধ করে দেবে। তখন আমাদের গার্মেন্টগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। এটা ঘৃণার জায়গা থেকে নয়, সরকারকে সচেতন করার জন্য বলছি।

রাসেল বলেন, ২০ মাসে সরকার টেক্সটাইল শিল্পবিরোধী অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাজেটে টেক্সটাইল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে; কিন্তু সুতায় আমদানি শুল্ক দিতে হয় না। করপোরেট কর সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করেছে। নগদ প্রণোদনা ক্রমেই কমিয়েছে। শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান সংশোধন করেছে-এ সিদ্ধান্তগুলো কি আত্মঘাতী নয়? এই সরকার একটা কারখানাও জন্ম দিতে পারেনি। এ সময় বন্ধ হয়েছে ২৫০টি গার্মেন্টস এবং ৫০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল। উৎপাদন অর্ধেক হিসাব করলে এই সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে। ফলে এই সরকারের পুরোটাই ব্যর্থতা বলে আমি মনে করি।

সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, এ মুহূর্তে টেক্সটাইল শিল্পকে অক্সিজেন দিয়ে আর বাঁচানোর সময় নেই। শিল্প আইসিউইতে চলে গেছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে বিশাল পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংকে টেক্সটাইলের জন্য আলাদা উইং চালু করতে হবে। ঋণের সুদহার স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। করপোরেট ট্যাক্স সাড়ে ১২ থেকে ২৭ শতাংশ করা হয়েছে। এটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজিব হায়দার বলেন, সুতা ডাম্পিং করে ভারত বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে। প্রাকারান্তরে এটি পরাধীনতার শামিল। উৎপাদন ব্যয় একই হওয়া সত্ত্বেও শুধু প্রণোদনার কারণে ভারত আড়াই ডলারে সুতা বাংলাদেশে ডাম্পিং করছে। এই আগ্রাসনের পরিণতি যে কত ভয়াবহ, আজ থেকে তিন মাস পর তা পরিসংখ্যানই বলে দেবে। কতজন মিল চালাচ্ছেন, কতজন বন্ধ করে দিয়েছেন-তখনই সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকা পারস্পারিক শুল্কের শর্তে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে। আমরা কি সেই শর্ত পূরণে নীতি গ্রহণ করতে পেরেছি, ভারত থেকে সুতা আমদানির মাধ্যমে সেই শর্ত কি পূরণ করা আদৌ সম্ভব? এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা উচিত। উষ্মা প্রকাশ করে রাজিদ হায়দার বলেন, কলকারখানা বন্ধ হলে বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যার সমাধান অটোমেটিক্যালি হয়ে যাবে। তখন তো বিদ্যুৎ-গ্যাসের চাহিদা থাকবে না। সেদিনই বোধহয় আসছে। কারণ, মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম