ইরানের রাস্তায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী
সামনে জেন-জি পেছনে ট্রাম্প
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ ইরান। শুক্রবার রাতেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় নেমে আসেন -ইন্টারনেট
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের জনবিক্ষোভ দমাতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও জনগণ বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হচ্ছেন। প্রশাসন ও সর্বোচ্চ নেতা খামেনির হুঁশিয়ারি-কোনো কিছুই তারা এখন তোয়াক্কা করছেন না। বৃহস্পতিবারের বড় বিক্ষোভের পর শুক্রবার রাতেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় নেমে আসেন। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা সরকার পতন দাবিতে স্লোগান দেন। এরই মধ্যে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা আইআরজিসি বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে। ওদিকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হবে বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর ইরান ইন্টারন্যাশনাল, এএফপি, বিবিসি, আলজাজিরার।
লন্ডন থেকে প্রচারিত সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে রাজধানী তেহরানের সাদাতাবাদে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। এছাড়া কুদস স্কয়ারেও অনেকে এসেছেন। এর পাশাপাশি তাবরিজেও বিক্ষোভকারীদের দেখা গেছে। তারা ‘স্বৈরাচারের পতন হোক’-সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন। নাভিদ মোহেব্বি নামে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর আয়াতুল্লাহ খামেনির হোম টাউন মাসহাদে এত মানুষ জড়ো হয়েছেন যে একদিক থেকে আরেকদিক দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় টানা সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে একটি মসজিদে আগুন এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পূর্ববর্তী সময়ের পতাকা উড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসকে লাদান নামে ৬০ বছরের এক নারী জানিয়েছেন, তিনি টানা দ্বিতীয় রাত রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি দেখেছেন বিক্ষোভকারীরা একটি মসজিদে আগুন দিয়েছে। বৃহস্পতিবারের মতো শুক্রবার রাতেও বিক্ষোভ মাসহাদ, তাবরিজ, উরুমিয়াহ, ইস্ফাহান, কারাজ ও ইয়জদে ছড়িয়েছিল। বিবিসি ফারসির প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। তারা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু কামনা করে আর রাজতন্ত্রের (শাহ শাসন) পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে বিক্ষোভে অংশ না নিতে সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানানো হয়। মা-বাবার উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় বলা হয়, আপনার সন্তানদের বিক্ষোভে যেতে দেবেন না। সতর্কতা দিয়ে বলা হয়, যদি সেখানে গোলাগুলি হয় এবং আপনার সন্তানের কিছু হয়, তাহলে অভিযোগ করবেন না।
বিবিসি জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন এবং অনেকে বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হন। এমন সময় তাদের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তা পাঠানো শুরু করেছে ইরান সরকার। তাদের বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকতে সতর্কতা দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড এবং পুলিশ এসব খুদেবার্তা পাঠাচ্ছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলের একটি হাসপাতালে তিনি একাধিক মানুষকে দেখেছেন, যাদের মাথায় গুলি করা হয়েছে। অনেকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার তারা আহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতি এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে রাখলেও হাজার হাজার জনতা রাস্তায় নেমে আসেন।
আমির রেজা নামে ৪২ বছর বয়সি এক প্রকৌশলী তেহরান থেকে জানিয়েছেন, তিনি গুলি ও সাউন্ড বোমার শব্দ শুনতে পেয়েছেন। একপর্যায়ে সিভিল পোশাকে মিলিশিয়া ও পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করলে তিনি বাড়িতে চলে যান। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে নিরাপত্তাবাহিনী আকাশের দিকে গুলি ছুড়ছে।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের।
বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা : ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে। শনিবার আলাদা বিবৃতিতে এই রেড লাইন ঘোষণা করে আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “দুরাত ধরে সন্ত্রাসীরা সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখলের চেষ্টা করছে, বেশ কয়েকজন নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা-কর্মীকে হত্যা করেছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করছে। ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির নিরাপত্তার স্বার্থে আইআরজিসি ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করছে। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতির চেষ্টা করলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
আরেক বিবৃতিতে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘ইরানের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সেনাবাহিনী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
ট্রাম্পের সহযোগিতা চাইলেন ক্রাউন প্রিন্স পাহলভি : সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেওয়া লোকজনদের নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ইরানের নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি। তাদের আন্দোলন সফল করতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহযোগিতাও চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্টের এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘জনাব প্রেসিডেন্ট, আমি জরুরি ভিত্তিতে আপনার মনোযোগ, সমর্থন এবং পদক্ষেপ আশা করছি। গত রাতে ইরানের লাখ লাখ সাহসী মানুষকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়া হয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা) তার টিকে থাকার সর্বশেষ পন্থা হিসাবে সহিংসতাকে বেছে নিয়েছে। ইরানের জনগণ এখন বুলেটের মুখোমুখি এবং আমরা সেখানকার খবর জানতে পারছি না।’
গুলিতে ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত : ইরানে চলমান বিক্ষোভে শুধু রাজধানী তেহরানেই এক রাতে ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন। বৃহস্পতিবার রাতে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় বিক্ষোভাকারীরও সহিংস হয়ে উঠেন। এর জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক গুলি ছোড়ে। টাইম ম্যাগাজিন শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নাম গোপন রাখার শর্তে তেহরানের এক চিকিৎসক তাদের জানিয়েছেন, শুধু তেহরানের ছয়টি হাসপাতালে ২০৬ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগ গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শুক্রবার হাসপাতাল থেকে এসব লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, উত্তর তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনের বাইরে বিক্ষোভকারীদের মেশিনগান থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। সেখানে অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল তরুণ।
হত্যাযজ্ঞের শঙ্কা নোবেলজয়ী শিরিন এবাদির : ইরানে ব্যাপক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে সরকার হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে বলে শুক্রবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইরানি মানবাধিকার আইনজীবী শিরিন এবাদি। এক বিবৃতিতে শিরিন এবাদি বলেছেন, আজ রাতে আমি জরুরি অবস্থার কথা জানাতে বাধ্য হচ্ছি। আজ রাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যাপক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার আড়ালে একটি হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করার চেষ্টা করতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইরানের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু তাদের জবাব গুলিতে দেওয়া হয়েছে। ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়। এটি একটি কৌশলমাত্র। তিনি পশ্চিমা সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন অবিলম্বে সরকারের ওপর প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করে, যাতে বেসামরিক মানুষের ওপর সরাসরি গুলি চালানো বন্ধ হয়, হাসপাতালগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে কঠোর হামলা চালানো হবে : চলমান আন্দোলনের বিক্ষোভকারীদের যদি ইরান সরকার হত্যা করে, তাহলে কঠোর হামলা চালানো হবে বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান সরকার এ মুহূর্তে বিপদে আছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান (সরকার) বড় বিপদে আছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে বিক্ষোভকারীরা অনেক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এমনটি সম্ভব হতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহ আগে কেউ চিন্তাও করেনি। আমরা খুবই সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছি, যদি আগের মতো তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করে, আমরা এর সঙ্গে জড়িত হব। এর অর্থ এ নয় যে, আমাদের সেনারা ইরানে যাবে। কিন্তু এর অর্থ হলো তাদের সেখানে খুবই কঠোর কঠোর হামলা চালাব, যেখানে হামলা চালালে তারা সবচেয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হবে। এমনটি হোক, আমরা চাই না।’
