Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

ভুল নীতি ও যড়যন্ত্রের ফাঁদে টেক্সটাইল: শেষ পর্ব

আমদানিনির্ভরতার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আমদানিনির্ভরতার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

Advertisement

ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে পঙ্গু করে আবারও আমদানিনির্ভরতার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। নগদ প্রণোদনা হ্রাস এবং বন্ডের আওতায় সুতা-কাপড় আমদানির মতো ‘অদূরদর্শী নীতি’র কারণে মালিক-শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে তিলে তিলে গড়ে ওঠা টেক্সটাইলশিল্প এখন কোনোমতে দম ফেলছে। ফলে এ খাত প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঝুঁকিতে পড়েছে। অন্যদিকে আমদানিনীতি সংশোধন করে তৈরি পোশাকশিল্পের এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সীমা বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। এতে দেশের অ্যাক্সেসরিজশিল্প মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমদানি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৩ বছরে ধারাবাহিকভাবে কটন সুতা আমদানি বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৩ দশমিক ৫ কোটি ডলারে ২২ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪৯ কোটি ডলারে ৪৫ দশমিক ৫ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছে। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭৯ কোটি ডলারে ৫৫ দশমিক ৬ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছে। এসব সুতার বেশির ভাগ আমদানি হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে।

যদিও বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো সুতা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, বর্তমানে বছরে ৪০০ কোটি কেজি নিট ও ওভেন সুতার চাহিদা রয়েছে, এর বিপরীতে স্পিনিং মিলগুলোর ক্যাপাসিটি রয়েছে ৩৯৭ কোটি কেজি। অর্থাৎ সুতার উৎপাদন ঘাটতি মাত্র ৩ কোটি কেজি। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সুতা আমদানি বৃদ্ধির পেছনে সরকারের অদূরদর্শী নীতি দায়ী। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে প্রণোদনা, জ্বালানিতে ভর্তুকি ও কর ছাড় দিয়ে শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ চলছে উলটোপথে। নতুন কূপ অনুসন্ধান না করে জ্বালানি খাতকে এলএনজি আমদানিনির্ভর করা হয়েছে বিধায় গত ৩ বছরে গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। এ সময় বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। ডলারের সংকট, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি, ব্যাংক সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট ধাপে ধাপে ১৫-১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় শিল্পের সক্ষমতা কমেছে। পক্ষান্তরে প্রতিযোগী দেশগুলো প্রণোদনা দিয়ে তাদের শিল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে। যেমন-ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বস্ত্র খাতে মোটা অঙ্কের প্রণোদনার পাশাপাশি ৮ ধরনের নীতি সহায়তা দিচ্ছে। রাজ্য সরকারগুলোও ভিন্ন ভিন্ন নামে সহায়তা দিয়ে আসছে। ওদিকে ভিয়েতনাম বন্ড সুবিধা সংকুচিত করেছে।

এ বিষয়ে ইশরাক স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক সোমবার যুগান্তরকে বলেন, সুতার আমদানিনির্ভরতার বিপদ অত্যাসন্ন। তৈরি পোশাক খাতকে এর চূড়ান্ত ফল ভোগ করতে হবে। কেননা গত বছর আমেরিকা যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পালটা শুল্ক আরোপ করে, তখন বাংলাদেশ দুটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রথমত, আমেরিকা থেকে আমদানি বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি পণ্যের স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াবে। এর ধারাবাহিকতায় স্থানীয় স্পিনিং মিল মালিকরা তুলা আমদানি ৫ গুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে ৩৭ শতাংশ থেকে পালটা শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এখন যে হারে সুতা আমদানি হচ্ছে, তাতে আমেরিকার তুলার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে। এ কারণে তৈরি পোশাকের স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনও হ্রাস পাবে।

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমেরিকা থেকে তুলা আমদানি হ্রাস ও ভারত থেকে সুতা আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের নজরে এলে তা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। তখন আমেরিকার পালটা শুল্কহার বাড়ালেও বাংলাদেশ এ নিয়ে টুঁ শব্দও করতে পারবে না। সে সময় যার চূড়ান্ত ফল ভোগ করতে হবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে। তাই সময় থাকতে উপযুক্ত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় সুরক্ষা জরুরি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক টেক্সটাইল মিল মালিক যুগান্তরকে বলেন, একের পর এক সরকারের ভুল নীতির কারণে টেক্সটাইলশিল্পে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো টেক্সটাইলশিল্পের দুর্দশার কথা স্বীকার করলেও নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। যার ফল ভোগ করছে এই শিল্প। ইতোমধ্যেই অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেক মালিক গোপনে মিল ভাড়া দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ইউডি-ইউপি জালিয়াতির মাধ্যমে কাস্টমসের সহযোগিতায় বন্ধ গার্মেন্টের নামে সুতা আমদানি করা হয়। পরে সুতাবোঝাই ট্রাক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এই জালিয়াতির সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। আর যারা কোনোমতে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের জন্য চাপ অব্যাহত আছে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বোতাম, জিপার ও কার্টুনসহ নানা অ্যাক্সেসরিজ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট ও অন্য রপ্তানিমুখী শিল্পের অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং তৈরি করে প্রায় ২ হাজার ১০০টি প্রতিষ্ঠান। গার্মেন্টশিল্পের এফওসি’র সীমা বাড়ানোর মাধ্যমে এ শিল্পকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

গত নভেম্বরে এফওসির সীমা বৃদ্ধির পদক্ষেপে উদ্বেগ জানিয়ে বাণিজ্য সচিবকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)। এতে বলা হয়, আমদানিনীতি আদেশ সংশোধন করে এফওসি সীমা তুলে অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বন্ড লাইসেন্সধারী গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যার প্রভাব পরে পরোক্ষভাবে তৈরি পোশাকশিল্পেও পড়বে। ফলে দেশের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে সরকারের পরামর্শ করা সমীচীন।

এ বিষয়ে বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক হিসাবে অ্যাক্সেসরিজ খাতের মোট রপ্তানি আয় প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এখানে ৭ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। কিন্তু সরকার এফওসির সীমা বাড়ানোর মাধ্যমে এ শিল্পকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ ধরনের নীতি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর নতুন শিল্প গড়ে উঠবে না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম