Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিক্ততা এখন ক্রিকেটে

ভারতের কিছু কাজে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে -সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির * যে কোনোভাবেই সমঝোতায় যাওয়া উচিত ছিল -সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান * সব কিছুতে রাজনীতি টেনে আনা উচিত নয়-অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম

Advertisement

পারভেজ আলম চৌধুরী পারভেজ আলম চৌধুরী

হক ফারুক আহমেদ হক ফারুক আহমেদ

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিক্ততা এখন ক্রিকেটে

Advertisement

যেন আগাথা ক্রিস্টির কোনো রহস্যোপন্যাস। আলফ্রেড হিচককের সাসপেন্স, থ্রিলারে ভরা সিনেমা কিংবা ছোট গল্পের সংজ্ঞা-শেষ হইয়াও হইল না শেষ। আবার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিক্ততার ঢেউয়ে ক্রিকেটের তরি দোদুল্যমান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন-পরবর্তী সমস্যাসংকুল সময়ের কশাঘাতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিক্ততা স্পর্শ করেছে ক্রিকেটকেও। এই অনাবশ্যক ও অনভিপ্রেত অনুষঙ্গ ‘ভদ্রলোকের খেলা’ ক্রিকেটকে ফেলে দিয়েছে দুষ্টচক্রের ঘূর্ণিপাকে। যার সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়ে দেখা দিয়েছে ভারতে কট্টরপন্থিদের মোস্তাফিজ-বিরোধিতা। তারই জেরে আইপিএল থেকে বাংলাদেশের বাঁ-হাতি পেসারকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ক্রিকেটকে কলুষিত করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫ আগস্ট-উত্তর টানাপোড়েনে এই অকিঞ্চিৎকর ঘটনা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার ওপর প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিয়েছে। আশা ও আশঙ্কার দোলাচলে দুলছে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ।

নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে টি ২০ বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) একচুলও নড়েনি। তাদের ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ করাতে পারেনি আইসিসি। মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সমস্যার সমাধানসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিসিবি আবারও বিশ্বকাপে তাদের সব ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে আইসিসিকে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানিয়েছে, ‘নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি থাকায় ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিসিবি আবারও আইসিসিকে অনুরোধ জানিয়েছে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।’ আইসিসি অনুরোধ করেছে, বিসিবি যেন তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে ‘অনুরোধের আসর’ চলছে। টি ২০ বিশ্বকাপ শুরু হবে ৭ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবে বাকি আর মাত্র ২৬ দিন। হাতে সময় অনেক কম। এত অল্প সময়ে সংকটের সুরাহা কীভাবে করবে আইসিসি, সে এক প্রশ্ন। ভিডিও কনফারেন্সে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবিকে অনুরোধ করেছে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে। বিসিবির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আইসিসি জানিয়েছে যে, টুর্নামেন্টের সূচি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তাই ভারতে না খেলার সিদ্ধান্ত যেন বিসিবি পুনর্বিবেচনা করে। দুপক্ষই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে পেতে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, অফিশিয়াল ও স্টাফদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিসিবি। পাশাপাশি বিষয়টির মীমাংসায় পৌঁছতে আইসিসির সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে অনেক বছর ধরে ক্রিকেট খেলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের দিক থেকে এমন কিছু কাজ করা হয়েছে যার কারণে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে, অখুশি হওয়ার কারণও জানিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থানকে যদি সম্মানজনকভাবে দেখা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, এমন বোঝাপড়ার জায়গায় আসা গেলে বাংলাদেশ এখন খেলার কথা চিন্তা করতে পারে। বিষয়টি এমন অবস্থানে যাওয়া উচিত নয় যে, আর খেলা যাবে না। ভারত ও পাকিস্তানকে আমরা নিজেদের দেশে না খেলে দুবাইতে খেলতে দেখেছি। সম্মানজনকভাবে সমাধানের সুযোগ থাকলে খেলার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করি।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘কূটনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে মনোমালিন্য বা ঝগড়াঝাটি করা ঠিক নয়। এতে কেউই উপকৃত হয় না। এসব বিষয়কে যে কোনোভাবেই হোক সমাধান করতে হয়। কূটনীতিতে বিষয়গুলো এমন যে, একদিন কেউ এক অংশ কম পেলে আরেক দিন আরেকটি অংশ বেশি পাবে। এভাবে কোনো না কোনোভাবে একটি সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হয়। সেটা যে কোনো বিষয়, যে কোনো দেশের সঙ্গেই।’

তিনি বলেন, ‘নানা বিষয় আছে যার কারণে বাংলাদেশ খেলতে না যাওয়ার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এতটা কঠোর হওয়ার পক্ষে নই। মনে করি, যে কোনোভাবেই একটি সমঝোতায় যাওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশে ক্রিকেটের যে উত্থান এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে হয়েছে। ক্রিকেট খেলার দেশ হিসাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম যে পরিস্থিতিতেই অন্য দেশে খেলতে যাক না কেন তারা বাংলাদেশের দূত হিসাবে যায়। সেই সুযোগগুলো আমাদের গ্রহণ করা উচিত। ক্রিকেটে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। তাই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না, যাতে আইসিসি বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আমাদের প্রতি বৈরী হওয়ার সুযোগ পায়। কারণ, বর্তমান এই রাজনৈতিক বৈরিতা এক সময় চলে যাবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম যুগান্তরকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে মনে করি, সবকিছুতে রাজনীতি টেনে আনা উচিত নয়। খেলাধুলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি নিয়েও যদি রাজনীতি হয় সেটি দুঃখজনক। মোস্তাফিজের বিষয়টি ভারত যেভাবে নিয়েছে, তা তাদের উচিত হয়নি। তার জবাবে বাংলাদেশ কঠিন অবস্থানে গেছে, সেটিও ঠিক হয়েছে বলে মনে করি না। দুপক্ষের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার একটি জায়গায় আসা উচিত ছিল; বা কোনো একটি ‘মেকানিজম’ ব্যবহার করে সমস্যাটির সমাধান করলে ভালো হতো।’

তিনি বলেন, ‘অতি উৎসাহী লোক অনেক। সব সময় রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা না করে ডিপ্লোম্যাসির দিক থেকেও চিন্তা করতে হয়। জনমতের গুরুত্ব আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীক প্রয়োজনের বিষয়টিও বুঝতে হয়। সেদিক থেকে এটি বাংলাদেশের জন্য ভালো হয়নি।’

ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেওয়া এক পরিচালক যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুপক্ষই ইতিবাচক ছিলাম। আইসিসি সুন্দর করে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে ভারতে খেলার জন্য। আমরাও নিজেদের নিরাপত্তার শঙ্কা এবং অবস্থান ভালোভাবে বোঝাতে চেয়েছি। আমরা এখনো আশাবাদী। আলোচনা চলবে।’ ভিডিও কনফারেন্সে বিসিবির পক্ষে অংশ নেন সভাপতি আমিনুল ইসলাম, দুই সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন এবং প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী।

সংকটের শুরু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর। কোনো কারণ ছাড়াই আইপিএলে তার দল কলকাতা নাইটরাইডার্স নিজেদের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের বাঁ-হাতি পেসারকে ছেঁটে ফেলার পর দুদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়। এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। তারই জেরে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ রাখতে প্রজ্ঞাপন জারি করে তথ্য মন্ত্রণালয়। সবশেষ গত পরশু যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, আইসিসির নিরাপত্তা কমিটি মোস্তাফিজকে ছাড়াই ভারতে গিয়ে খেলাসহ তিনটি শর্ত দিয়েছে বিসিবিকে, যা মেনে নেওয়া অসম্ভব।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম