Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান

বিএনপি কখনো ‘গুপ্ত’ বা ‘সুপ্ত’ বেশ ধারণ করেনি

কেউ কেউ গণতন্ত্রের পথকে আবার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি কখনো ‘গুপ্ত’ বা ‘সুপ্ত’ বেশ ধারণ করেনি

গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের এক সন্তান মতবিনিময় সভায় বক্তৃতাকালে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে -যুগান্তর

Advertisement

বিএনপির আপসহীন ভূমিকার কারণে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে এ দলকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা কখনো কখনো হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে কিংবা আন্দোলন কখনো তুঙ্গে উঠেছে। এ আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য গুম-খুন-অপহরণ-মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও নির্যাতনের পরও বিএনপির একজন নেতাকর্মীও রাজপথ ছাড়েনি। একই পরিবারের এক ভাই গুম হয়েছে, আরেক ভাই গিয়ে তার জায়গায় পরের দিন রাজপথে আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপির কর্মীরা। শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমি বিশ্বাস করি, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারে; সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ তাদের দমন করে রাখতে পারবে না। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আগামী দিনের গণতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা; সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক অনেক দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না।

তারেক রহমান বলেন, বহু সন্তান আজও অপেক্ষায় আছে, তাদের গুম হয়ে যাওয়া বাবা একদিন ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। বহু মা এখনো আশায় আছেন, হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি আবার ‘মা’ বলে ডাকবে। এই অপেক্ষা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় দায়। গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর কষ্ট এমন গভীর যে, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

তিনি বলেন, সব শহীদের আত্মত্যাগকে জনমনে স্মরণীয় করে রাখতে আগামী দিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই মুহূর্তে হয়তো বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারছি না। কিন্তু বলতে কষ্ট হচ্ছে, আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশনের রিসেন্টলি কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তার পরও একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসাবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে এ মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’। অনুষ্ঠানে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সভায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেওয়ার সময় তারেক রহমানকে কাঁদতে দেখা যায়।

কেউ কেউ গণতন্ত্রের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে : দলীয় নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কথা বলে একটি অবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করছে, যাতে গণতন্ত্রের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। অনুরোধ করব, বাংলাদেশের দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন; তাদের সজাগ থাকার জন্য। যারা বিভিন্ন উসিলা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে, গণতন্ত্রের পথকে আবার নষ্ট করার বা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে, তারা যাতে সফল না হয়।

অতীতের সব অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আগামীতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরি মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এবার যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করি, তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের যে শহীদ, তাদের প্রতি জুলুম করা হবে। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অমর্যাদা করা হবে।

গুম ও হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’৭১ সালে যারা শহীদ হয়েছেন এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যারা গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, ’২৪-এর আন্দোলন ও ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, প্রতিটি অন্যায়ের বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগামী দিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।

তারেক রহমান আরও বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে শহীদ ও গুমের শিকারদের আত্মত্যাগ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় থাকে, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে শহীদ পরিবারদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে।

সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা জানা নেই : দীর্ঘদিনের আন্দোলন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বহু বছর আমাকে বাধ্য হয়ে দেশ, স্বজন, মানুষ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। দূর থেকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, দলীয় অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করেছি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব উপস্থিতি রাখতে, প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলতে। ঠিক একইভাবে আমরা সে সময় যতটুকু সাধ্য ও সামর্থ্য ছিল তা দিয়ে চেষ্টা করেছি স্বজনহারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে। কতটুকু পেরেছি, কতটুকু পারিনি, সেটির জবাব ভিন্ন। তবে এতটুকু বলতে পারি, আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে ভবিষ্যতেও।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা করা হয়েছে। হাজারের মতো নেতাকর্মীকে গুমের শিকার হতে হয়েছে। সারা দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মামলা করা হয়েছিল। যার বোঝা প্রায় ৬০ লাখের মতো নেতাকর্মীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। এর ভেতরে লাখ লাখ নেতাকর্মী বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছাড়া থাকতে হয়েছে। স্বজনহারা থাকতে হয়েছে। স্বজন থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এ সব মামলাই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

গুম-খুনের সেই বিভীষিকাময় দিন বা রাতের অবসান হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। যেসব মানুষ স্বজন হারিয়েছেন, মায়েরা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, বোনেরা স্বামীকে হারিয়েছেন, সন্তানরা পিতাকে হারিয়েছেন; তাদের সত্যিকারে যদি বলতে হয় সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা বোধহয় আমাদের কাছে নেই। এক দুঃসহ সময় আমরা অতিক্রম করেছি।

তিনি বলেন, যে সন্তান তার পিতাকে না দেখার কষ্টের কথা বলেছে। আমরা জানি না, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন-সেই সন্তান তার পিতাকে আবার কোনো দিন দেখবে কিনা। অনেক সন্তান এখনো অপেক্ষায় আছে।

আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে এবং মায়ের ডাকের সভানেত্রী সানজিদা ইসলাম তুলি, আমরা বিএনপি পরিবারের সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনি ও মোকসেদুল মোমিন মিথুনের যৌথ সঞ্চালনায় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গুম থেকে ফিরে আসা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, আমরা বিএনপি পরিবারের রুহুল কবির রিজভী, আতিকুর রহমান রুমন, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, গুম হওয়া এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনাসহ গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম