ইরানে হামলার শঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কায় নতুন করে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানসহ একাধিক দেশ। তাদের আশঙ্কা, এমন হামলা হলে উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে না, বরং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথেও তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। শনিবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ার ফ্রান্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি তাদের দুবাইগামী সব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে। এছাড়া দুবাই, রিয়াদ, দাম্মাম এবং তেলআবিবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফ্লাইট বাতিল করেছে কেএলএম রয়্যাল ডাচ্ এয়ারলাইনস। নিরাপত্তার খাতিরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ইরানে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং এয়ার কানাডাও ইসরাইলে তাদের বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের সিনিয়র ফেলো জোশুয়া ইয়াফ জানান, ইরানে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা বা সরকার পরিবর্তন হলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আরও শক্তভাবে ক্ষমতা দখল করতে পারে। যা পুরো অঞ্চলের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। যদিও সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও দেশটি তার সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি। এর আগে গত বছরের জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে তেলআবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। সে সময় ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পালটা প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের সাম্প্রতিক দুর্বলতাকে সামরিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ হিসাবে দেখলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন। সৌদি আরব, কাতার ও ওমান মনে করছে, এই সময়ে সামরিক হামলার চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনা বেশি কার্যকর। চলতি মাসের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার ইঙ্গিত দেন। এরপর সৌদি আরব, কাতার ও ওমান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। যদিও বিক্ষোভ কমে আসায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে, তবুও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এরই মধ্যে ট্রাম্প জানান, একটি ‘বড় সামরিক শক্তি’ ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি আরব সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন হামলার বিরোধিতা করছে কারণ তারা আশঙ্কা করছে, তারা সংঘাতের মাঝে পড়তে পারে। সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এমন এক সময়ে মার্কিন হামলার শঙ্কা বাড়ছে যখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন হামলা একটি তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
এদিকে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের হামলাকে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসাবে গণ্য করবে তারা। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি বহর ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়ার পর শুক্রবার এই মন্তব্য করেন ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানো হয়তো সরাসরি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয়, কিন্তু ইরান সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছে। এদিকে একই দিনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ইরানকে আক্রমণ করার জন্য ইসরাইল বর্তমানে একটি ‘সুযোগ খুঁজছে’। তিনি আরও জানান, ইসরাইলের এমন পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে আরও ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় কয়েকটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। কেএলএম, লুফথানসা ও এয়ার ফ্রান্সের মতো বড় সংস্থাগুলো এই অঞ্চলে তাদের পরিষেবা স্থগিত রাখায় ইসরাইল, দুবাই ও রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের বিমান যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ট্রাম্পের ইরানের দিকে মার্কিন রণতরির বহর অগ্রসর হওয়ার কথা ঘোষণা করার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, একটি শক্তিশালী মার্কিন রণতরির বহর ইরানের দিকে যাত্রা করেছে।
ইরানের সঙ্গে জড়িত ৯ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : ইরানে সম্প্রতি বিক্ষোভ দমনে প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার দেশটির ‘শ্যাডো ফ্লিট’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়টি জাহাজ ও আটটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। রয়টার্স। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরান সরকারের দমনমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, ইরানি জনগণের কাছ থেকে আত্মসাৎ করা এবং বিদেশি ব্যাংকে পাঠানোর চেষ্টায় থাকা কোটি কোটি ডলারের লেনদেন ট্রেজারি নজরদারিতে রাখবে।
উল্লেখ্য, ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বলতে সাধারণত এমন জাহাজগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বহন করে। এসব জাহাজ বেশির ভাগই পুরোনো, মালিকানার তথ্য অস্পষ্ট এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় শীর্ষমানের বিমা কভারেজ ছাড়াই চলাচল করে। যা বড় তেল কোম্পানি ও অনেক বন্দর গ্রহণ করে না।
