বেহাল টেক্সটাইল শিল্প
বন্ডের ফাঁদে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গার্মেন্টের বন্ড সুবিধায় আনা সুতা বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার ও নরসিংদীর মাধবদী, বাবুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে স্থায়ী সুতা বিক্রির মার্কেট। এ কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার চাহিদা কমে যাচ্ছে। কারখানার গুদামে অবিক্রীত সুতার পাহাড় জমেছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টিরও বেশি মিল। বন্ড অপব্যবহারের কারণে শুধু শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, সরকারও হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। তারপরও কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার নীরব ভূমিকা পালন করছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গার্মেন্ট মালিক নামধারী দেশের স্বার্থবিরোধী একটি চক্র বন্ডের সুতা-কাপড় কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাস্টমস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যোগসাজশে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্র। তারা বন্ড লাইসেন্সে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে চুটিয়ে এই চোরাকারবারির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে শুধু দেশের সম্ভাবনাময় টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাতই ধ্বংস হচ্ছে না, সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। শুধু বন্ডের সুতা-কাপড় বিক্রি করেই শূন্য থেকে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন অনেকে। যাদের মধ্যে কেউ কেউ একসময় ছিলেন হকার, সেলসম্যান কিংবা প্রবাসী শ্রমিক।
খোদ রাজধানীর ইসলামপুরে চোরাই কাপড়ের বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকাশ্যে দিনের পর দিন প্রশাসনের নাকের ডগায় এত বড় অপরাধ সংঘটিত হলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন চোখ-কান বন্ধ করে বসে আছে। অথচ এর নেতিবাচক প্রভাবে দেশের টেক্সটাইল খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বন্ডের সুতা বিক্রি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার, নরসিংদীর মাধবদী, বাবুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ দেশের আনাচে-কানাচে। বন্ড কমিশনারেটগুলো মাঝেমধ্যে লোকদেখানো দু-একটি অভিযান (প্রিভেন্টিভ) করলেও পর্দার আড়ালে তারা চোরাকারবারিদের লালনপালন করে আসছে। ফলে দেশের টেক্সটাইল মিলগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, প্রাইমারি টেক্সটাইল সেক্টরের স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিলের সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৯টি। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। জিডিপিতে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের অবদান ২০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে বিটিএমএ-এর মিলগুলো রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের নিট ও ওভেন ফেব্রিকের প্রয়োজনীয় সুতার চাহিদার যথাক্রমে প্রায় শতভাগ ও ৬০ শতাংশ পূরণ করছে। অথচ বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, বন্ড সুবিধায় বানের পানির মতো সুতা-কাপড় আমদানি হচ্ছে। এর মধ্যে আবার মিথ্যা ঘোষণায় নিম্ন কাউন্টের সুতার পরিবর্তে উচ্চ কাউন্টের সুতা অবৈধভাবে আমদানি করছে। বাস্তবে মিলের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও সুতা-কাপড় আমদানি করে দেদার খোলাবাজারে বিক্রি করছে। ফলে স্থানীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলের সুতা ও কাপড় অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে স্থানীয় শিল্প রক্ষার্থে অনতিবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথা বন্ড কমিশনারেটের সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি করা উচিত। যার কাজ হবে বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজ আকস্মিক পরিদর্শন করা। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে কাস্টম হাউজগুলোয় এলসিতে উল্লিখিত পণ্যের সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের মান যথাযথভাবে যাচাইয়ের জন্য অটোমেটেড মেশিন স্থাপন জরুরি।
এ বিষয়ে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বস্ত্র খাত ভীষণ দুঃসময় পার করছে। এক বছর ধরে সরকারের কাছে বারবার সহযোগিতা চেয়েছি। কোনো সহযোগিতা পাইনি। সর্বশেষ বাণিজ্য মন্ত্রণলায় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এনবিআর কোনো আদেশ জারি করছে না। এদিকে প্রতিযোগী সক্ষমতায় টিকতে না পেরে প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো মিল বন্ধ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি টেক্সটাইল শিল্পের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। কারণ, কারখানা চালিয়ে লোকসান দেওয়ার সক্ষমতা কোনো মিল মালিকের নেই। ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকলে অনেক মালিক মাথায় টেনশন নিয়ে এই ব্যবসায় আর থাকতে চান না।
‘সরকারের ভুলনীতির খেসারত দিচ্ছে বস্ত্র খাত’ দাবি করে রাসেল যুগান্তরকে বলেন, আশির দশকে সুতার অপচয় ছিল ১৫ শতাংশ। ধাপে ধাপে বাড়িয়ে সেটা ৩২ শতাংশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ অত্যাধুনিক মেশিনের কারণে অপচয় হ্রাস পাওয়ার কথা। এই সুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু তুলা আমদানিতে শুল্ক বসানো হয়েছে, আবার ফিনিশড প্রোডাক্ট সুতায় শুল্ক নেই। টেক্সটাইল শিল্পের করপোরেট কর হারও বেশি। তার ওপর টার্নওভার কর ও ভ্যাট পরিশোধের চাপে রয়েছে।
বাদশা টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদশা মিয়া বলেন, ৪৬ বছর ধরে বন্ড সুবিধা চলমান। আর কতদিন এটা চলবে। এ কারণে ব্যাকওয়ার্ড শিল্প দাঁড়াতে পারছে না। এই সুবিধা বহাল রেখে বিদ্যমান ব্যাকওয়ার্ড শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। গার্মেন্ট মালিকরা এই ষড়যন্ত্রের পরিণতি আঁচ করতে পারছেন না। ভারত এখন কম দামে সুতা ডাম্পিং করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দেশের স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ভারত একচেটিয়া সুতার দাম বাড়াবে। যেমনটা করেছিল করোনার সময় তুলা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে। তিনি আরও বলেন, নীতি গ্রহণের উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে সরকার দেশে মূল্য সংযোজনকারী শিল্প চায় না। শুধু মজুরির (কাটিং-মেকিং) ব্যবসা করতে চায়। বন্ড সুবিধায় অবাধ আমদানি বহাল রাখায় তাই মনে হচ্ছে।
বিটিএমএ-এর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। প্রথম ধাপে বন্ডের সুতা ও ভারতীয় আগ্রাসনে টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হবে। যখন এই ধাপ সম্পন্ন হবে, তখন ভারত সুতা দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে অকেজো করে দেবে। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হবে মার্কিন পালটা শুল্ক ও জিএসপি প্লাস সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য মূল্য সংযোজনের চাপ। স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে একসময় আমেরিকা ও ইউরোপ বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা তুলে নিলে এমনিতেই তৈরি পোশাক খাত প্রতিযোগী সক্ষমতা হারিয়ে বিশ্ববাজার থেকে ছিটকে পড়বে। তিনি আরও বলেন, ট্যারিফ কমিশন আমদানির সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ডের বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে, যা বাস্তবনির্ভর ও যুক্তিসংগত। কিন্তু কোথায় গিয়ে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে গেল? সরকার আসলেই শিল্প নিয়ে ভাবছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
