৩৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চায় পিডিবি
Advertisement
শাহেদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আসন্ন রমজান, জাতীয় নির্বাচন, সেচ মৌসুম এবং গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে। বাড়তি চাহিদার বিদ্যুতের জন্য ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সরকার এ ভর্তুকি না দিলে আগামী মাস থেকে দেশ লোডশেডিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে পারে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগকে এমন চিঠি দিয়ে পিডিবি জানিয়েছে, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সংস্থাটি বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতির মধ্যে পড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। এরপরও পিডিবি লোকসানে আছে ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটি টাকার বেশি। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি পিডিবির কাছে পাওনা ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, অর্থাভাবে পিডিবি সরকারি-বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে বিল দিতে পারছে না। শীতের আবেশ কেটে গরমের মৌসুম আসছে। চাহিদাও বাড়ছে বিদ্যুতের। এখন ভর্তুকির মাধ্যমে পিডিবিকে অতিরিক্ত টাকা না দিলে নির্বাচন, সেচ এবং রমজানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হবে। এমনটি হলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পিডিবির অর্থ বরাদ্দের চাহিদার ব্যাপারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, এ সরকারের মেয়াদ অনেকটা শেষ। এখন নতুন করে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন সরকার এসে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে পিডিবির সচিব মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এছাড়া ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৫ দশমিক ০২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৫০ টাকা করেছে পেট্রোবাংলা। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিদ্যুৎ বিক্রির দাম গত কয়েক বছর বাড়ানো হয়নি। তাই সরকারি ভর্তুকির পরও ২০২১-২০২২ সালে ১ হাজার ৬২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭৬ হাজার ৮২৭ টাকা, ২০২২-২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭০ কোটি ৯০ লাখ ৪৭ হাজার ২৫৭ টাকা, ২০২৩-২০২৪ সালে ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯ হাজার ১০৫ টাকা এবং ২০২৪-২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৫৭৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯২ হাজার ৮২২ টাকা লোকসান দিয়েছে পিডিবি। একই সময়ে অর্থাৎ ২০২২ সালে ১২ হাজার ৮০০ কোটি, ২০২৩ সালে ২৯ হাজার ৫১১ কোটি, ২০২৪ সালে ৩৩ হাজার কোটি এবং ২০২৫ সালে ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
পিডিবি জানায়, গ্যাস এবং তেলভিত্তিক অপ্রয়োজনীয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন এবং কয়লাভিত্তিক আদানি, এসএস পাওয়ার, রামপাল, পায়রাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম তুলানামূলকভাবে বেশি। এ কারণে ৮ বছর ধরে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পিডিবি এখন প্রতি ইউনিট ১২ দশমিক ৩৫ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে বিক্রি করছে ৬ দশমিক ৬৩ টাকা। এতে প্রতিমাসে ঘাটতি হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি বিষয়ে তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটি বলেছে, বিগত আওয়ামী সরকার অপ্রয়োজনীয় ৭৭০০ থেকে ৯৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছিল। এ কারণে প্রতিবছর সরকারকে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল দিতে হচ্ছে।
সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি। এখন চাহিদা ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও কয়েকদিন ধরে রাজধানী ছাড়া সারা দেশে লোডশেডিং হচ্ছে। সোমবার দুপুরে লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। পিডিবির একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলো ৮-৯ মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পায় না। তারা ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারছে না। একইভাবে গ্যাসের বিল ও ব্যাংকের দেনা দিতে পারছে না বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি। দেনার কারণে অনেক কোম্পানির তেল আমদানির এলসি খুলছে না ব্যাংক। ওই কর্মকর্তা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে হয়তো বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। নতুবা ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে। বিগত সরকার বিদ্যুৎ খাতে ইচ্ছামতো বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর অনুমতি দিয়ে পুরো খাতকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
