আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে প্রচারণা
ঝগড়া করতে এলে ছাড় দেওয়া হবে না
তিন জেলায় জামায়াতের জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, কেউ পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে এলে ছেড়ে দেওয়া হবে না। সমান ওজনের হিসাবনিকাশ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। মঙ্গলবার খুলনায় আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। এর আগে যশোরে আয়োজিত জনসভায় তিনি বলেন, ‘‘আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন বলছে জনগণকে ফ্যামিলি কার্ড দেবে এবং তা মহিলাদের হাতে। আবার ওই মহিলারা যখন অন্য আদর্শ, নতুন বাংলাদেশের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে যাচ্ছেন, তখন তাদের গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছে। একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত-এ দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।’’ এছাড়া এদিন জামায়াত আমির সাতক্ষীরায় এক জনসভায় বক্তব্য দেন। তিনটি জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি।
ঝগড়া বাধাতে এলে ছেড়ে দেওয়া হবে না : খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগরী ও জেলা শাখা আয়োজিত জনসভার কাজ দুপুর ২টায় শুরু হয়। এখানে দেওয়া বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কারও পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাই না। কিন্তু কেউ ঝগড়া বাধাতে এলে ছেড়েও দেওয়া হবে না। আজ বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়েছে, মাথা গরম হয়ে গেছে। এখন মাথা গরম হলে চৈত্র মাসে কী করবেন? মাথা ঠান্ডা রাখেন। এখন তো আরামদায়ক বাতাস আছে, ভালো আবহাওয়া আছে, এ সময় মাথা গরম করিয়েন না। জনগণের গায়ে হাত দিতে পারবেন, পিঠে চাবুক মারতে পারবেন; কিন্তু জনগণের হৃদয় এবং কলিজা জয় করতে পারবেন না।’
খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী, খুলনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল, খুলনা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, খুলনা-৪ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খুলনা-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি রেজাউল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা নেতা রাশেদ প্রধান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
খুলনাকে উন্নয়নবঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একসময় খুলনাকে বলা হতো শিল্পের রাজধানী। শিল্প ৫৪ বছরেও বিকশিত না হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে আছে। দুনিয়ার দেশগুলো শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা শিল্পকে একটা একটা করে খুন করছি। এ শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। কথা দিচ্ছি, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে বন্ধ কলকারখানা চালু করব। নতুন করে ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করব।’
দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জনগণের সম্পদকে পানির নিচে লুকিয়ে রাখবেন না। বেগমপাড়া গড়বেন না। নিজেদের জন্য সিঙ্গাপুর বানাবেন না। অনেকেই সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদের প্রবণতায় গান গাইতে চান। কিন্তু যুবসমাজ ওই বস্তা পচা পুরোনো বন্দোবস্ত চায় না।’
একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত-এ দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না : যশোর ব্যুরো জানায়, এদিন সকাল ১০টায় যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন বলছে জনগণকে ফ্যামিলি কার্ড দেবে এবং তা মহিলাদের হাতে। আবার অন্যদিকে ওই মহিলারা যখন অন্য আদর্শ, নতুন বাংলাদেশের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে যাচ্ছে, তখন তাদের গায়ে হাত দিচ্ছে। একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত-এ দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা আপনাদের আদর্শ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করুন, আমরা ওয়েলকাম করব। কিন্তু আমাদের আদর্শ-কর্মসূচি প্রচারে আপনারা বাধা দেওয়ার কে? আমাদের কোনো মা-বোন, কোনো সহকর্মী যদি নির্বাচনি বিধি ভঙ্গ করে, সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বলুন। তারা প্রয়োজনে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। আমরা সেটি মাথা পেতে নেব। কিন্তু আপনি কে আইন হাতে তুলে নেওয়ার! আবার যদি এ ধরনের কোনো আচরণ করা হয়, সেখানেই প্রতিরোধ করা হবে-কোনো ছাড় নয়।’
গণভোটের প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম ভোট হবে ‘হ্যাঁ’। কেননা ১৮ কোটি মানুষ পরিবর্তন চায়, পুরোনো ব্যবস্থায় আর ফিরতে চায় না। ‘হ্যাঁ’ মানে হলো আজাদি, আর ‘না’ হলো গোলামি। আমরা গোলামি করতে চাই না। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে বাংলাদেশ জিতে যাবে, পরাজিত হলে হেরে যাবে। আমরা বাংলাদেশকে হারতে দেব না।’ এ সময় যশোরের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে ক্ষমতায় গেলে তা পূরণের আশ্বাস দেন তিনি। বক্তব্য শেষে তিনি যশোরের ছয়টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। জনসভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ মোবারক হোসাইন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, যশোর-১ আসনের মাওলানা আজিজুর রহমান, যশোর-২ আসনের ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ, যশোর-৩ আসনের আব্দুল কাদের, যশোর-৫ আসনের অ্যাড. গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনের মোক্তার আলী, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েল প্রমুখ। যশোর জেলার ৮টি উপজেলা থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ভোর থেকে দলে দলে দাঁড়িপাল্লা ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে জনসভাস্থলে উপস্থিত হন।
জামায়াত সরকার গঠন করলে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটমুক্ত দেশ গড়বে : সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, দুপুর সাড়ে ১২টায় সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়ত জনসভায় বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে এবং একপর্যায়ে দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৫ তারিখে আল্লাহ আমাদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। ওই সময় আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। জননিরাপত্তা রক্ষায় নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালনের কথা বলেছি। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।’
তিনি বলেন, ‘ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা ভেবেছিল এই অবস্থা চিরকাল থাকবে। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, আর যাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেন।’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘দেশের তরুণ সমাজ পরিবর্তনে আমাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমরা সরকার গঠন করতে পারলে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটমুক্ত দেশ গড়ব। একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সাতক্ষীরার চারটি আসনে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করার আহ্বান জানাই।’ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল। আরও বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ-সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়াও ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের নেতারাও বক্তব্য দেন। জনসভা পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।
