সংবাদ সম্মেলনে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ
বেকার হওয়ার আতঙ্কে ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মিল মালিকদের আলটিমেটাম অনুযায়ী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে স্পিনিং মিল বন্ধ হলে এ খাতে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন। যদি শেষ পর্যন্ত মিল বন্ধ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে এই বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লে দেশে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। বিশেষ করে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়বে। এ পরিবারগুলো পথে বসে গেলে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ অবস্থায় সংকট নিরসনে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন থেকে ভুক্তভোগী-শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্পিনিং মিলগুলো ভালোভাবে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
দুপুরে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আজহার আলী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ২২ জানুয়ারি মিল মালিকরা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানা বন্ধ রাখার আলটিমেটাম দিয়েছেন। এ রকম উদ্ভূত পরিস্থিতিতে টেক্সটাইল শিল্পে কর্মরত শ্রমিকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে এ শিল্পে প্রায় ২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৮ লাখ শ্রমিক কর্মরত আছেন। পহেলা ফেব্রুয়ারি মিল বন্ধ হয়ে গেলে এসব শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেকার হয়ে যাবেন। এর ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী বেকার হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে যেমন বিরূপ পড়বে, তেমনি সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলাও বিনষ্ট হবে। সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ স্পিনিং খাত দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত বৈষম্য, অতিরিক্ত বন্ড সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের মুখে পড়েছে। এই শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান এবং ভবিষ্যৎ টেকসই নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বিটিএমএ, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করা জরুরি। এজন্য তিনি কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারের কাছে জোরালোভাবে আহ্বান জানান।
স্পিনিং মিল রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আজহার আলী বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুতার দামের সামঞ্জস্য রাখার জন্য কমপক্ষে দুই বছরের জন্য ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এছাড়া এফওসি সুবিধা ১৫-২০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বর্তমানে ৫০ শতাংশ চালু আছে। অতিরিক্ত এফওসি চালু থাকলে ব্যাকওয়ার্ড সংশ্লিষ্ট সব টেক্সটাইল খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাকওয়ার্ড শিল্পগুলোর সক্ষমতা যাচাই পূর্বক পর্যায়ক্রমে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য একটি কার্যকর নীতিমালা দ্রুত তৈরি করতে হবে। যাতে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ডাইস কেমিক্যাল এবং স্পিনিং ও উইভিংয়ের স্পেয়ার পার্টস উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শিল্প দেশে গড়ে উঠতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যমুনা গ্রুপের পরিচালক ও বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্কেটিং প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এবিএম সিরাজুল ইসলাম, মোশাররফ গ্রুপের পরিচালক (অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, স্পিনিং কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ ও গেটকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক রুহুল আমিন আশিক প্রমুখ।
যমুনা গ্রুপের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এবিএম সিরাজুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ২ বছর ধরে মিলগুলো ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ওভারহেড খরচ বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন কমতে থাকলে লোকসান দিয়ে কারও পক্ষেই কারখানা চালানো সম্ভব নয়। শিল্পের অবস্থা কোন পর্যায়ে গেলে একজন মালিক মিল বন্ধের ঘোষণা দেন-তা সরকার অনুধাবন করতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, একটা শিল্পকে ধ্বংস করে আরেকটা শিল্পকে সুবিধা দেওয়া অনুচিত, এটা বিটিএমএ, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতাদেরও উপলব্ধি করা উচিত। টেক্সটাইল মিল মালিকরা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিপক্ষ নয়, একে অন্যের পরিপূরক। তাই সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে এ খাত রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি নিয়ে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে; যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। ইতোমধ্যেই আমরা বিটিএমএ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে মিল বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা চাই বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর নেতারা আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করুক। কোনো অবস্থায় যেন কারখানা বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেদিকে সরকারসহ সব পক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে একদিনের ব্যবধানে নীতি গ্রহণ করে, বন্দর বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেয়; সেখানে গত দুই বছর ধরে সাধারণ একটি নীতির জন্য স্পিনিং মিলগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের এক মন্ত্রণালয় আরেকটিকে পক্ষকে দোষারোপ করছে। এ কারণে উদ্যোক্তাদের মাঝেও বিভাজন তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বন্ড সুবিধা আজীবনের জন্য চলতে পারে না। একটন সুতা লাগলে ১০ টন সুতা আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ কারণে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় স্থানীয় মিলগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
