Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে

জ্বালানি সংকট, ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং

Advertisement

Icon

শাহেদ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি সংকট, ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমদানির পরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বিশ্ববাজারে। বাংলাদেশমুখী তেলের ২টি জাহাজ নির্ধারিত সময়ে আসছে না। এ কারণে ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পেট্রোল পাম্পগুলোকে চাহিদার ১০ শতাংশ কম ডিজেল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ‘তেল পাওয়া যাবে না’ আতঙ্কে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন পড়েছে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তেল বিক্রি ঠেকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে, এই মাসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি কার্গো দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কাতার এনার্জি। এর পরিবর্তে উন্মুক্ত বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বুধবার পর্যন্ত কোনো বিক্রেতার খোঁজ পায়নি। এ সপ্তাহের মধ্যে ওই দুই কার্গোর বিকল্প ব্যবস্থা করতে না পারলে ১৫ মার্চের পর দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিতে পারে। শুরু হতে পারে গ্যাসেরও রেশনিং। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে শিল্প ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বুধবার সকালে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকের পর জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের ধাক্কা বাংলাদেশে চলে এসেছে। তাই তেল ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিপণিবিতানগুলোতে আলোকসজ্জা করবেন না।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের আজ ষষ্ঠ দিন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বিশেষ করে ডিজেলের মজুত অনেক কম। মাত্র ৯ দিনের। গত ৩-৪ দিন বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প এবং ডিলাররা দেদার ডিজেল উত্তোলন করে মজুত বা বিক্রি করেছে। স্বভাবত এই সময়ে দৈনিক ১১ থেকে ১২ হাজার টন বিক্রি হলেও এখন হচ্ছে ১৩ হাজার টনের বেশি। এ কারণে দেশের ২ হাজার ৩০৭টি পাম্পকে তার স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে ১০ শতাংশ তেল কম দিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সোমবার থেকে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২২ ডলারের বেশি বেড়েছে। ৮০ ডলারের তেল গিয়ে ঠেকেছে ১০৯ ডলারে। এ কারণে এখন প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের লোকসান ৪০ টাকার বেশি। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচারের শঙ্কা করছে জ্বালানি বিভাগ। এ কারণে সকালে জ্বালানিমন্ত্রী বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড-বিজেবির মহাপরিচালকের সঙ্গে কথাও বলেছেন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ৪ মার্চ ডিজেল ছিল মাত্র ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ টন (মজুত ৯ দিন), অকটেন ২৮ হাজার ১৫২ টন (মজুত ১৫ দিনের), পেট্রোল ১৭ হাজার ৩৬৪ টন (মজুত ৮ দিনের) ফার্নেস অয়েল ৬৬ হাজার ১৯২ টন (মজুত ৬০ দিন), জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৮৪ টন (মজুত ৩৬ দিন) কেরোসিন ৩০ হাজার ৯৫৯ টন (মজুত ১৭০ দিন)।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে ১৫ থেকে ১৬টি তেলের জাহাজ (পার্সেল) আসে বাংলাদেশে। এ মাসে ৭ মার্চ ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আসবে এমটি লাকি, ৮ মার্চ একই পরিমাণ ডিজেল নিয়ে এমটি রাফেলস সামুরাল, ১৫ মার্চ এমটি সান টেলমো, ১৮ মার্চ এমটি ট্রম দিল্লি আসার শিডিউল রয়েছে। বাকিগুলো এখনো নিশ্চিত করেনি।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নাজুক হয়ে উঠছে। তেল সরবরাহকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলে পার্সেলগুলো শুধুই পিছিয়ে দিচ্ছে। এখন ১ বা ২টি পার্সেল ঠিকমতো না এলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।

জনগণের প্রতি সরকারের আহ্বান : জ্বালানি বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কারণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে। এই পরিস্থিতিতে মার্কেটে সাজসজ্জা পরিহার, ব্যক্তিগত যানবাহন কম ব্যবহার ও খোলা বাজারে ডিজেল বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশে প্রতিবছর ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের দরকার হয়। এর মধ্যে ৪০ লাখ টনের বেশি হচ্ছে ডিজেল।

এদিকে, মঙ্গলবার রাত ১১টায় তেজগাঁও ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই সময়েও গাড়ির দীর্ঘ লাইন। গাড়িগুলোতে তেল নিতে ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। ফিলিং স্টাফ রবিউল জানান, দুদিন ধরে রাত ১টা পর্যন্ত গাড়ির দীর্ঘ লাইন থাকছে। সবাই আতঙ্কে তেল কিনছে। ওই পাম্পের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগে দৈনিক ৫০ লাখ টাকার তেল বিক্রি করা হলেও এখন সেখানে ৮০ লাখ টাকার তেল বিক্রি হচ্ছে। তবে এর বেশির ভাগই অকটেন।

এলএনজির সরবরাহ কমতে পারে : সোমবার টার্মিনালে হামলার পর কুয়েত এনার্জি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার কুয়েত জানিয়েছে, ১৫ ও ১৮ তারিখে এলএনজির দুটি কার্গো তারা দিতে পারবে না। এর বিকল্প হিসাবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনতে মঙ্গল ও বুধবার চেষ্টা করেছে জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি)। কিন্তু কোথাও এলএনজি পাওয়া যায়নি। পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। বাংলাদেশে এলএনজি বিক্রি করার অনুরোধ জানাতে বুধবার সচিবালয়ে ডাকা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে। তিনিও ঢাকাকে এলএনজি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রদূত জ্বালানিমন্ত্রীকে বলেছেন, ইন্দোনেশিয়ায় যে এলএনজি আছে, সেটি তার দেশের ব্যবহারের জন্য। বিদেশে বিক্রির জন্য নয়। সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারের এলএনজি চীন ও ভারত কিনে নিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের মতো গ্রাহকরা তেমন পাত্তা পাচ্ছে না।

এদিকে, সফররত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর বুধবার সকালে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় জ্বালানিমন্ত্রী মার্কিন সহকারী মন্ত্রীকে বাংলাদেশে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব দেন। বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে বাংলাদেশকে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা আছে ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এখন সরবরাহ আছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আবার এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে ১০০ কোটি ঘনফুটের মতো। এখন এলএনজি বন্ধ হলে দেশে বড় সংকট তৈরি হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম