Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

বিএফআইইউ প্রতিবেদন

রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার

Advertisement

হামিদ বিশ্বাস

হামিদ বিশ্বাস

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার

Advertisement

রপ্তানিকারকের নাম সিরাজুল ইসলাম। যিনি এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ এই রপ্তানিকারকের বিরুদ্ধে। পাচারকৃত টাকার পরিমাণ প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা। এছাড়া রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের ৪ মাস পার হয়ে গেলেও তিনি এখনো ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে আনেননি। এসব অর্থ পাচারের মাধ্যম হিসাবে তিনি ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক মহাখালী করপোরেট শাখাকে।

সম্প্রতি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রাথমিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। যদিও যুগান্তরের কাছে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক।

জানতে চাইলে এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার সিরাজুল ইসলাম দুবাই থেকে মুঠোফোনে যুগান্তরকে জানান, ‘আমি অর্থ পাচার করিনি। এসব ঘটনা করোনাকালীন সময়ের। ব্যাংক যথাসময়ে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেয়নি। তাই কিছু সমস্যা হয়েছে। ৭৪টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আসেনি। এটা ধীরে ধীরে নিয়ে আসব। এই বিল আগে ১০০টির বেশি ছিল। সেখান থেকে কমিয়ে এনেছি।

পর্যায়ক্রমে পুরো দায় পরিশোধ করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংক ৩৮ কোটি টাকা পাবে। কিছু দিন খেলাপি ছিলাম। এখন সেটা নবায়ন করা হয়েছে।’

বিএফআইইউ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে ২২৭টি ইএক্সপি বা রপ্তানি চালানের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় ৭৫ লাখ ৭৮ হাজার মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি দেখিয়েছে এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড। তবে পণ্যের এইচএস কোডভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রপ্তানিকৃত পণ্যের ইউনিট মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে ১ দশমিক ৭৮ গুণ থেকে ১০ দশমিক ৬৪ গুণ পর্যন্ত কম দেখানো হয়েছে।

এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত রপ্তানি মূল্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার থেকে ৮ কোটি ৬ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ৫৮ লাখ ২২ হাজার ডলার থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়ে থাকতে পারে, যা দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২০ টাকা করে) প্রায় ৭০ কোটি থেকে ৮৭৬ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতি পিস টি-শার্ট, প্যান্ট বা ট্রাউজারের মূল্য ১ থেকে ১ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার দেখানো হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩০ থেকে ২০০ টাকা। গোয়েন্দা সদস্যদের মতে, এ ধরনের পণ্যের বাজারমূল্য সাধারণত এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এছাড়া একই গন্তব্যে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ইনভয়েস ইস্যুর মাধ্যমে বড় চালানকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করার ঘটনাও পাওয়া গেছে, যা শুল্ক নজরদারি এড়ানোর কৌশল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরও দেখা গেছে, রপ্তানির অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পরপরই তা নগদে উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২০ সালের আগস্টে হিসাব খোলার পর থেকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জমা ও সমপরিমাণ উত্তোলন হয়েছে। ফরেন বিল পারচেজ ও নগদ জমার অর্থ একই দিনে বা স্বল্প সময়ের মধ্যে নগদে তুলে নেওয়ার একাধিক দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। তদন্তকারী সংস্থার মতে, এ ধরনের লেনদেন অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার প্রচেষ্টা হতে পারে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. সিরাজুল ইসলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিবন্ধিত ‘মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক। রপ্তানি চালানের বড় অংশই ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেখানো হয়েছে। তবে বিদেশে বিনিয়োগ বা কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের কোনো তথ্য ব্যাংক নথিতে পাওয়া যায়নি। একই ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া জাহাজীকরণের ৪ মাস পার হলেও ৭৪টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আসেনি। দেশীয় মুদ্রায় যা ৪২ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এটি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত নির্দেশনার লঙ্ঘন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অপরাধের শামিল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গোয়েন্দা ইউনিটের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, দুবাইভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ‘নোটিফাই পার্টি’ হিসাবে মালয়েশিয়ার একটি তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স অর্থ রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনের নামে দেশে পাঠানো হয়েছে কিনা, অথবা অবৈধ হুন্ডি বা হাওলা পদ্ধতির সংশ্লেষ আছে কিনা তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

সার্বিক বিবেচনায় আন্ডার ইনভয়েসিং, সম্পর্কিত পক্ষের মধ্যে লেনদেন, রপ্তানি মূল্য দেশে প্রত্যাবাসনে বিলম্ব এবং অস্বাভাবিক নগদ লেনদেনের মতো বিষয়গুলো গভীর তদন্তের দাবি রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সাভারের বিরুলিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব রয়েছে। সেখানে ৪০০ থেকে ৪৫০ কর্মী কাজ করেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড। তবে দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অগ্রণী ব্যাংকের মহাখালী শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশনের অত্র শাখায় ঋণের পরিমাণ ৯০ কোটি টাকার বেশি। যার বেশির ভাগই এখন খেলাপি। তবে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের একজন ডিজিএম জানান, প্রতিষ্ঠানটি কিছু দিন খেলাপি থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। অর্থ পাচার সন্দেহের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক জানায়, এ সংক্রান্ত যত তথ্য চেয়েছে সব তথ্য বিএফআইইউকে দেওয়া হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি ব্যাংকে যে আর্থিক দুর্বলতা এটার শুরু হয় ঋণের নামে বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে যেন অর্থ পাচার না হয় সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে। অর্থ পাচারের সঙ্গে যদি কোনো ব্যাংকের জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম