Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

দিশেহারা উবার-পাঠাও চালকরা

দুই চাকার কষ্টের জীবনে ২ লিটারের ধাক্কা

Advertisement

তোহুর আহমদ

তোহুর আহমদ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুই চাকার কষ্টের জীবনে ২ লিটারের ধাক্কা

Advertisement

খুলনার বাসিন্দা আবির হাসান ঢাকায় পাঠাও (রাইড শেয়ারিং) অ্যাপসে বাইক চালান ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। দুই চাকার এই বাইক চালিয়েই তার তিন সদস্যের সংসার চলে। ঘামঝরা এমন জীবনে সামান্য যা কিছু আয় হয়, তা থেকে কিছু জমিয়ে গ্রামে থাকা বৃদ্ধ মায়ের জন্যও পাঠান। কিন্তু হঠাৎ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা যেন আবিরের দুই চাকার সংগ্রামী জীবনকেও থামিয়ে দিতে চায়। মাথার উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত নেমে আসে, যখন তিনি শুনতে পান একবারে ২ লিটারের বেশি জ্বালানি তেল মিলবে না। এই যুদ্ধের কারণে সরকারের জ্বালানি আমদানিতেও টান পড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-আবির হাসানের সংসারের ঘানি টানার যুদ্ধটা এখন আরও কষ্টের হয়ে গেল।

শনিবার প্রতিবেদক যখন দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে সরেজমিন এমন তথ্য তালাশ করছিলেন, তখন আবির হাসানদের গল্পের যেন শেষ হচ্ছিল না। যতদূর চোখ যায় তেল নিতে অপেক্ষমাণ শত শত মোটরসাইকেলের সারি। সবার চোখেমুখে ছিল দুই চাকার ওপর ভর করে সংসার চালানোর নিদারুণ কষ্টের ছাপ। তাই অন্তত এ বিবেচনায় তাদের জন্য এই শর্ত শিথিল করা হোক। এমন দাবিতেই সরব ছিলেন সবাই। তারা বলছিলেন, এভাবে চলতে থাকলে তাদের অনেককে হয়তো না খেয়ে পথে বসতে হবে।

দুপুরে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে পিনাক্যাল পাম্পের সামনে কথা বলার সময় আরও অনেক বাইক চালক দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমাণ। কিন্তু যথারীতি পাম্প বন্ধ। বাইকারদের দেখিয়ে আবির হাসান বলেন, ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে রাজধানীর বেশির ভাগ পাম্পই এখন আর তেল দিচ্ছে না। কোথাও বা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্বল্প পরিমাণ তেল পেলেও তা দিয়ে ৩-৪টির বেশি রাইড হয় না। তিনি বলেন, সারা মাস বাইক চালিয়ে খরচ বাদে তার হাতে সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা থাকে। তা দিয়ে তিন সদস্যের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু বাসা ভাড়াই ৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া তার এক ছেলে এবার এসএসসি পরিক্ষার্থী। সন্তানের লেখাপড়া এবং পরিবারের সবার খাওয়াসহ অন্য খরচ আছে। ফলে স্বাভাবিক সময়েই তাকে ধারদেনা করে চলতে হয়। সামনে ঈদ। ফলে আকস্মিক এই তেল সংকট তার খেটে খাওয়া জীবনে ভিন্ন এক সংকট নিয়ে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে প্রায় ১২ লাখ মোটরসাইকেল নিবন্ধিত। এর বাইরে আরও অনেকে অ্যাপ নিবন্ধন ছাড়াই চুক্তিতে রাইড শেয়ারিং করেন। সব মিলিয়ে বাইক রাইড শেয়ারিং ঘিরে অন্তত ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। এছাড়া নানা কারণে শিক্ষিত বেকার যুবকদের অনেকেই পেশাদার বাইক রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু আকস্মিক তেল সংকটের কারণে এ খাতের ওপর নির্ভরশীলদের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে।

রাজধানীর ব্যস্ত পাম্পগুলোর অন্যতম হচ্ছে খিলক্ষেত এলাকার ইসরাইল তালুকদার ফিলিং স্টেশন। চলতি মাসে তেল সংকট শুরুর পর থেকেই এখানে যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ। পাম্পের সামনে প্রতিদিনই শত শত বাইকসহ অন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে শনিবার দুপুর থেকে এখানেও তেল বিক্রি বন্ধ। এদিন দুপুর আড়াইটায় পাম্পের সামনে ‘তেল নাই পাম্প বন্ধ’ লেখা হলুদ ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, পাম্প বন্ধ হয়ে গেলেও কয়েকশ যানবাহন তখনও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমাণ। গাড়ির সারি নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার গেট পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। অথচ এসব গাড়ির চালকরা তখনো জানেন না ইতোমধ্যে পাম্প বন্ধ হয়ে হয়ে গেছে। লাইনে কয়েকশ বাইক এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়াও সিভিল এভিয়েশন, পাসপোর্ট, বিএসটিআই ও শিল্প পুলিশসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার গাড়িও দেখা যায়।

তেলের দীর্ঘ লাইনের সামনে ‘সংসদ-সদস্য’ স্টিকারযুক্ত একটি নোয়া মাইক্রোবাস। কোনো ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ পাম্প বন্ধের নোটিশ দেখে গাড়ির এক আরোহী বেরিয়ে আসেন। পাম্পের অফিস কক্ষে ঢুকে তিনি পরিচয় দিলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন পাম্প মালিক হালিম তালুকদার। কিন্তু তিনিও নিরাশ করেন। এমপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন ‘পাম্পে এক ফোঁটা তেলও নেই। তাই আপনাকেও তেল দিতে পারছি না। অগত্যা তেল ছাড়াই ওই সংসদ-সদস্য তার গাড়ি ঘুরিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী এবং এর আশপাশে ১২৫টির মতো ফিলিং স্টেশন রয়েছে। কিন্তু শনিবার তেল সংকটের অজুহাতে অন্তত ৯০টি পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার পাম্প, সোনার বাংলা, কল্যাণপুরের খালেক পাম্প ও তেজগাঁওয়ের সাউদার্নসহ বিভিন্ন পাম্পের সামনে ছিল শত শত যানবাহনের সারি।

তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ বাইক চালক যুবায়ের হোসেন বলেন, দীর্ঘ লাইনে দেড় ঘণ্টারও বেশি দাঁড়িয়ে থেকে তিনি কোনোমতে পাম্পের কাছাকাছি আসতে পেরেছেন। কিন্তু বাইকে মাত্র ২ লিটার তেল দিচ্ছে। কয়েকটি রাইড নিলেই এই তেল শেষ হয়ে যাবে। ফলে কিছুক্ষণ পরই ফের তাকে দাঁড়াতে হবে তেলের লাইনে। তিনি তেল সংকটের অজুহাতে পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে কালোবাজারি এবং মজুতদারির অভিযোগ তোলেন।

শনিবার বিকালে তেজগাঁও শিল্প এলাকার সাউদার্ন পাম্পের সামনে অপেক্ষমাণ বাইকচালকরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। উত্তেজিত জনতা পাম্পে ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করে। তবে তৎক্ষণাৎ পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পাম্পের সামনে অপেক্ষমাণ সবুজ ব্যাপারি নামের এক বাইকচালক উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘কোনো সংকট নেই। এরা সবাই পেছনের দরজা দিয়ে কালোবাজারে তেল বিক্রি করে দিচ্ছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

তবে পাম্পমালিকরা বলছেন-বাস্তবে এখন পর্যন্ত তেলের তেমন কোনো সংকট নেই। সব ধরনের জ্বালানি তেলের সরবরাহ আগের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পাম্পে ভিড় করছেন। গাড়িতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি করে তেল নিয়ে রাখছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ অবৈধভাবে বাসাবাড়িতে তেলের ঝুঁকিপূর্ণ মজুত রাখছেন।

বৃহস্পতিবার বিজয় সরণিতে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ যানবাহন চালকদের আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকার পরামর্শ দেন আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরিচালক ব্রি. জেনারেল (অব.) জামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটা জিনিস অনুভব করছি যে-মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমি আহ্বান জানাব, আমরা সবাই যেন শান্ত থাকি। আতঙ্কিত না হই। যেহেতু সরকার বলছে কোনো সমস্যা নেই, সেহেতু আমাদের উচিত সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম