একান্ত সাক্ষাৎকারে আফরোজা খানম রিতা
অটল মনোবল থাকলে নারী নেতৃত্ব ইতিহাস রচনা করে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়া এক নাম আফরোজা খানম রিতা। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এই প্রথম একজন নারী, যিনি মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ভোটে প্রথমবার সংসদ-সদস্য হয়েই পূর্ণ মন্ত্রিত্ব লাভ করেন তিনি।
আফরোজা খানম রিতার গল্প শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের নয়; এটি দৃঢ়তা, নেতৃত্ব ও দায়বদ্ধতার গল্প। ঘর থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, দলীয় সংকট থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা প্রতিটি পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করে তিনি আজ বাংলাদেশের আকাশপথের দায়িত্বে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সঠিক সুযোগ ও অটল মনোবল থাকলে নারীর নেতৃত্ব থেমে থাকে না বরং ইতিহাস রচনা করে।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা, দুঃসময়ে দলকে আগলে রাখা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে তিনি আজ দেশের নীতিনির্ধারণী অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তার সঙ্গে কথা বলেছেন যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার মতিউর রহমান।
যুগান্তর : আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আপনার অনুভূতি কী?
আফরোজা খানম রিতা : নারী দিবস আমার কাছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম এবং সক্ষমতার স্বীকৃতি। বাংলাদেশের নারীরা আজ ঘর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা সব জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করেছেন। আমি নিজেকে সেই দীর্ঘ পথচলার একজন অংশগ্রহণকারী হিসাবে দেখি।
যুগান্তর : আপনি দেশের প্রথম নারী বিমানমন্ত্রী। এই দায়িত্ব কতটা চ্যালেঞ্জের?
আফরোজা খানম রিতা : বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সরাসরি দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত। একটি দেশের পরিচয়ে বিমানবন্দর অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সক্ষমতা, নিরাপত্তা, সেবার মান সবই এখানে প্রতিফলিত হয়। নারী হিসাবে নয়, একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী নয়; বরং একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসাবে আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করছি। তবে স্বাভাবিকভাবেই এটি গর্বের যে নারীরাও এখন সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যুগান্তর : প্রথমবার সংসদ-সদস্য হয়েই পূর্ণ মন্ত্রিত্ব অনেক বড় অর্জন। কীভাবে দেখেন?
আফরোজা খানম রিতা : এটি আমার একার অর্জন নয়। এটি মানিকগঞ্জবাসীসহ দেশের জনগণের আস্থা ও দলের বিশ্বাসের ফল। আমি সব সময় দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। দায়িত্ব যত বড়, জবাবদিহিও তত বড়। আমি সেই জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করতে চাই।
যুগান্তর : আপনার পরিবার রাজনৈতিক ও শিল্প অঙ্গনে সুপরিচিত। এই উত্তরাধিকার কতটা প্রভাব ফেলেছে?
আফরোজা খানম রিতা : আমার বাবা হারুণার রশিদ খান মুন্নু ছিলেন একজন দূরদর্শী শিল্পোদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, একাধিকবারের সংসদ-সদস্য ও বিএনপি সরকারের মন্ত্রী। ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা। দেশীয় সিরামিক শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে তিনি পথ দেখিয়েছেন। তার কাছ থেকে শিখেছি শৃঙ্খলা, পরিশ্রম এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা। বাবার শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের কাজ দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।
যুগান্তর : বিএনপির নেতৃত্বে আপনার ভূমিকা তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে অনেক পজিটিভ আলোচনা আছে। কঠিন সময়ে কীভাবে দলকে ধরে রেখেছিলেন?
আফরোজা খানম রিতা : রাজনৈতিক জীবন কখনো সহজ ছিল না। মানিকগঞ্জের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, দমন-পীড়ন সবকিছুই দেখেছি। আমি মনে করি, রাজনীতি মানে শুধু মিছিল বা বক্তব্য নয়; এটির লক্ষ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আইনি সহায়তা থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা যা সম্ভব তার সবটুকু করেছি। এজন্য আমার শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও আমি মনে করেছি দল মানে একটি পরিবার। পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্ববোধ থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।
যুগান্তর : একই সঙ্গে বড় শিল্প গ্রুপ পরিচালনা, পরিবার সামলানো এবং রাজনীতি কীভাবে ভারসাম্য রাখেন?
আফরোজা খানম রিতা : সময় ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময় পরিকল্পনা করে কাজ করি। পরিবার আমাকে শক্তি দেয়। একজন মা হিসাবে, একজন উদ্যোক্তা হিসাবে এবং একজন রাজনীতিক হিসাবে প্রতিটি ভূমিকাই আমাকে পরিপূর্ণ করেছে। নারীরা আত্মবিশ্বাসী হলে বহু দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে পারেন বলে বিশ্বাস করি।
যুগান্তর : শিক্ষাজীবনে আপনি মেধাতালিকায় ছিলেন। নেতৃত্বে শিক্ষার ভূমিকা কতটা?
আফরোজা খানম রিতা : শিক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতিতে শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের অংশগ্রহণ করা উচিত। নীতিনির্ধারণে বিশ্লেষণী ক্ষমতা খুব জরুরি।
যুগান্তর : বিমান ও পর্যটন খাতে আপনার অগ্রাধিকার কী কী থাকবে?
আফরোজা খানম রিতা : নিরাপত্তা, সেবার মান বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী ভ্রমণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অবকাঠামো উন্নয়ন। পর্যটন খাতে বাংলাদেশকে সম্ভাবনার জায়গা থেকে বাস্তব সাফল্যের জায়গায় নিতে চাই। আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিশ্বে তুলে ধরতে হবে পরিকল্পিতভাবে।
যুগান্তর : আন্তর্জাতিক দিবসে দেশের নারীদের জন্য আপনার বার্তা কী?
আফরোজা খানম রিতা : নিজের স্বপ্নকে ছোট করে দেখবেন না। চ্যালেঞ্জ আসবেই। কিন্তু অধ্যবসায় ও সততা থাকলে পথ তৈরি হয়। নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারী নন, তারা নেতৃত্বও দিতে পারেন। নিজেকে প্রস্তুত করুন, দক্ষতা বাড়ান এবং সাহসী হোন-এটাই সবার জন্য বার্তা।
যুগান্তর : দৈনিক যুগান্তরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আফরোজা খানম রিতা : যুগান্তরকেও ধন্যবাদ।

