যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি
বছরে ১৩২৭ কোটি টাকা হারানোর শঙ্কা : সিপিডি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে দেশের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে মঙ্গলবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলা হয়।
রাজধানীর ধানমন্ডির নিজস্ব কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বহুমুখী চাপে পড়বে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এর মধ্যে রয়েছে-উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাস্তব পদক্ষেপ, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জোর দিতে হবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের চাপে পড়বে দেশ। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন এক সময়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ চাপ মোকাবিলায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া ডব্লিউটিও নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়বে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। এতে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ এতে বেশকিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি খাতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না, এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত। যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। তিনি জানান, বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়। তিনি আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরে আসা উচিত। কারণ চলতি অর্থবছরেও উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চলতি অর্থবছরে এই অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে রয়েছে। ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে ধীরগতি : উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডির মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু বড় প্রকল্পের ব্যয় সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমেছে। এদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে না : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র : বৈদেশিক খাতে মিশ্র পরিস্থিতি লক্ষ করা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে একই সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর কমানোর সুপারিশ : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমালে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ কারণে এসব পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
