মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রীর চমক
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল
Advertisement
সংসদ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বৃহস্পতিবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তাদের নির্বাচিত করা হয়। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সকালে তারা দুজনই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এমনকি তারা দুজন বিএনপির দলীয় পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে এ দুই নতুন মুখের মনোনয়ন বিএনপির চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমানের চমক হিসাবে দেখছেন অনেকেই।
এর আগে সভাপতির আসনে বসে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচনের জন্য একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নির্বাচিত হলে তিনি এই দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম এমপির প্রতি আহ্বান জানান। তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা সমর্থন করেন সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য রকিবুল ইসলাম। পরে প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদে পেশ করা হয় এবং সভাপতি তা ভোটে দেন। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়।
এরপর ডেপুটি স্পিকার পদে একটি মাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানান ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি হলেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। দায়িত্ব পালনে তিনিও সম্মত বলে জানান সভাপতি। প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সরকারদলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদারকে আহ্বান জানান ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তা সমর্থন করেন সরকারদলীয় হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান। এরপর প্রস্তাবটি সংসদে পেশ করা হয় এবং ভোটে দিলে এতে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়।
দুপুর ১২টার দিকে প্রথমে স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান। সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ দলের শীর্ষ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এই শপথ গ্রহণপর্ব অনুষ্ঠিত হয়। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সচিব কানিজ মাওলা।
পরে নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু সংসদের মাইকে বিভ্রাট থাকায় কিছুক্ষণ পরিচালনা করার পর ২০ মিনিটের জন্য সভার বিরতি দেন স্পিকার। স্বাগত বক্তব্যে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছিল। তারপরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে গণতন্ত্র। সংসদ ভবনের বর্ণনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা রোপণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও স্বৈরশাসকদের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের লড়াকু জনগণ প্রত্যেক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রাম করে গণতন্ত্রের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছে।
গণতন্ত্রের পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাঝেমধ্যে স্বৈরশাসকের পদধ্বনি আমরা শুনতে পেয়েছি। জনগণ বিড়ম্বিত হয়েছে। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ এক গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করেছে। এ সংগ্রামে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ প্রত্যেক শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারিতে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আমরা দেখতে পেয়েছি। আমার ১০টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এবারের নির্বাচনকে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন বলে মনে করি। এখন জনগণ অধীর আগ্রহে রয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রম দেখার জন্য। স্পিকার বলেন, সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়ার জন্য আমরা শপথবদ্ধ। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এ হোক আমাদের মূলমন্ত্র। সবশেষে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতুবি ঘোষণা করেন স্পিকার।
দলীয় পদ ছাড়লেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার : জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিএনপির দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর পৃথক চিঠিতে তারা এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদটি নিরপেক্ষ। পদত্যাগপত্রে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের অভিভাবক হিসাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করার স্বার্থে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটির সদস্য’ পদ থেকে পদত্যাগ করছেন।
অন্যদিকে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার চিঠিতে জানান, ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় তিনি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ‘আইন সম্পাদক’ পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। নির্বাচন শেষে বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান।
