এক-এগারো নিয়ে জেরার মুখে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
গোয়েন্দারা খুঁজছেন ২৫ প্রশ্নের উত্তর
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ গ্রেফতারের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক-এগারোর সরকার। ওই সরকারের কুশীলবদের মধ্যে অন্যমত ছিলেন এ দুই সেনা কর্মকর্তা। এক-এগারোর সময় কার, কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছেন গোয়েন্দারা। সূত্র বলছে, গোয়েন্দারা এ সংক্রান্ত ২৫টি প্রশ্ন প্রস্তুত করে এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যও পেয়েছেন তারা।
এদিকে এক-এগারো ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী সরকারের আমলে বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মামুন খালেদকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যা মামলায় গ্রেফতার হলেও তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে এক-এগারোর অন্যতম এ দুই কুশীলব বেশির ভাগ প্রশ্নেরই জবাব দিচ্ছেন না। কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠনের আগে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনে এই পদত্যাগ করানোর মিশনে অংশ নেন সশস্ত্র বাহিনীর তৎকালীন প্রভাবশালী ছয় কর্মকর্তা। সেখানে একটি চা-চক্রও হয়। এরপর থেকেই দ্রুত পালটে যেতে থাকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। মাসুদ উদ্দিনের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল-২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির দিন বঙ্গভবনে কখন গিয়েছিলেন? কে কে ছিলেন সেখানে? রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে কী বলে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ প্রশ্নের কৌশলী জবাব দেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি জানান, পদত্যাগে রাজি করানোর ওই মুহূর্তে তিনি ছিলেন না। তখন তিন বাহিনীর প্রধান, ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ছিলেন। তবে ওইদিন সেখানে তিনি চা-চক্রে অংশ নেন। তৎকালীন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসাবে সেখানে উপস্থিত থাকা অফিশিয়ালি বাধ্যতামূলক ছিল।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময় নির্যাতনের বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দফায় দফায় বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। তার কাছে প্রশ্ন ছিল-কারা কর্তৃপক্ষ তারেক রহমানকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুস্থ শরীরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু রিমান্ড শেষে তিনি কারাগারে আসেন ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। তাহলে কারা তাকে এভাবে নির্যাতন করেন, সেটি জানা দরকার। এ প্রশ্নের জবাবে বিতর্কিত এই সেনা কর্মকর্তা চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে বলেন, ‘তিনি এ বিষয়ে একেবারেই জানতেন না। পরদিন টিভিতে দেখে বিস্মিত হন। তখন তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নির্দেশে ডিজিএফআই-এর কিছু কর্মকর্তা ওই টর্চারে ভূমিকা রাখেন। এরপর তিনি মইন ইউ আহমেদকে ফোনে কল করে শাউট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।’ এভাবে উত্তর দেওয়ার সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তার তার এমন দাবি জোরালোভাবে নাকচ করে বলেন, ‘এভাবে মিথ্যা বলে লাভ নেই, আসল সত্যটা বলেন।’
এদিকে সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে ১/১১ সরকারের প্রধান হিসাবে কীভাবে মনোনীত করা হয়, কোন কোন দেশের রাষ্ট্রদূত এ প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত ছিলেন এবং ওই সময় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল-এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বলেন, প্রথমে ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধান হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই প্রস্তাব নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যান মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তৎকালীন ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তারা যান ফখরুদ্দীনের কাছে।
গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, মোসাদ্দেক আলী ফালু, নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু এবং হাজী সেলিমসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রভাবশালীদের গ্রেফতারে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেখানে তার ভূমিকা কী ছিল জানতে চাইলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কৌশলী জবাব দিয়ে জানান, তিনি গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির মুখ্য সমন্বয়ক ছিলেন। তবে গ্রেফতারের তালিকা তিনি করেননি। উচ্চপর্যায়ের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দুদলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কেন গ্রেফতার করা হয়-এই গ্রেফতারে কোন কোন দেশের সবুজ সংকেত ছিল, গ্রেফতার অভিযান শুরুর আগে কখন কোথায় নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়, ওই বৈঠকে কারা ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন মাত্র।
মাসুদের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল, গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসাবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রেফতারের আগে আপনি অনুমোদন দিতেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবে অনুমোদনের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে গ্রেফতারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিত।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানতে চান, সংসদ ভবনের বিশেষ কারাগারে এসে আপনারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে দরকষাকষি করতেন। ওই বৈঠকে আর কারা থাকতেন। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি।
এ বিষয়ে দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সাবজেল থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে একজন মেজর শেখ হাসিনাকে বের করে নিয়ে যেতেন এমন তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। তাকে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে করা গোপন বৈঠকে সেনাবাহিনীর সদস্য ছাড়াও এক-এগারো সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা অংশ নিতেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় শেখ হাসিনাকে কিভাবে আনা হবে সেসব বিষয়ে দেনদরবার হতো ওইসব বৈঠকে।
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে কারাগার থেকে বাইরে বের করে এনে এক-এগারোর কুশীলবরা বৈঠক করলেও আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বের হতে দেওয়া হতো না।
এদিকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির দুই দিন পর জরুরি ক্ষমতার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে বিধিমালা জারি করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আরও প্রশ্ন ছিল-২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির আগেই জরুরি ক্ষমতার অধ্যাদেশ ও বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন। জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন তারা অধ্যাদেশ ও বিধিমালা চূড়ান্ত করেছেন।
নতুন দল গঠন নিয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে গোয়েন্দা কর্মকর্তার প্রশ্ন ছিল-ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল ‘প্রগতিশীল রাজনৈতিক পার্টি’ গঠনের নেপথ্যেও আপনার ভূমিকা ছিল। জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী নিজেকে রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দল করেন। এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না।
জরুরি অবস্থা জারির পর দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠিত হয়-এই টাস্কফোর্সের সমন্বয় করতেন আপনি। তবে দুর্নীতি দমনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন আপনারা-এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৎপথে উপার্জন করে জীবন নির্বাহ করেছি।’ তবে তার এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এছাড়া মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কিছু প্রশ্নের উত্তর ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে দিলেও অনেক প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। তার কাছে গোয়েন্দাদের অন্যান্য প্রশ্নগুলো হলো-২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ড. ইয়াজউদ্দিন সরকারের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত কোন কোন দেশের রাষ্ট্রদূত ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আপনাদের বৈঠক হয়েছিল। মাইনাস টু ফর্মুলার মাধ্যমে জিয়া পরিবারকে শেষ করে দিতে আপনার পরিকল্পনা ছিল-কেন এই পরিকল্পনা করেছিলেন? এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর কে কে জড়িত ছিলেন।
এছাড়া গ্রেফতার থাকাকালে খালেদা জিয়াকে ১৩টি শর্ত দেওয়া হয়েছিল। সেই শর্তগুলো কি ছিল, শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসাতে আপনার ভূমিকা কি ছিল, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আপনি সিরিজ বৈঠক করেছিলেন-সেই বৈঠকে আর কারা থাকত। কেন আপনারা শেখ হাসিনাকে মুক্তির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তারেক রহমান আর রাজনীতি করবেন না বলে মুচলেকা দিয়েছেন-তার মুক্তির দিনে এমন গুজব ছড়ানো হয়েছিল। এ বিষয়টি আপনার মাথা থেকে এসেছিল-এমন তথ্য মিলছে।
নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে আপনার সমঝোতা হয়েছিল, এক-এগারোর সরকারের সময় কেন আপনারা বিএনপির ওপর চড়াও হয়েছিলেন। জরুরি অবস্থা জারির পর জনকণ্ঠের সম্পাদক ও মালিক আতিকুল্লাহ খান মাসুদকে গ্রেফতার করে ছেড়ে দেওয়া হয়, দুই দিন পর তাকে ফের গ্রেফতার করা হয়-কেন প্রথমে গ্রেফতার করে ছেড়ে দিলেন, আবার কেনইবা পরবর্তীতে গ্রেফতার করলেন। আইজিপি পদ থেকে খোদা বক্স চৌধুরীকে অপসারণ করে কেন নূর মোহাম্মদকে নতুন আইজিপি বানানো হলো, গ্রেফতারের আগে তারেক রহমানকে কেন সেনানিবাসের বাড়িতে নজরদারি করা হয়েছিল। নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে আপনারা লাখ লাখ ভুয়া ভোটার তৈরি করেন। কারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে যুবলীগ নেতা লিয়াকতকে আপনার নির্দেশে গুম করা হয়। কেন গুম করেন? এমন সব প্রশ্ন করা হয় সাবেক প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে।

