বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল
আদালতে ভুয়া ওয়ারেন্ট চক্রের ভয়ংকর দৌরাত্ম্য
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খোদ আদালতেই চলছে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির মহোৎসব। ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে এনে দেওয়া হচ্ছে ‘বিশেষ সুবিধা’; এমনকি সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে পালিয়ে যাওয়ারও! শুধু তাই নয়, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষের নামে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা। কতিপয় পুলিশ ও আইনজীবী এবং আদালত ও কারাগারের অসাধু কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমনই এক সংঘবদ্ধ চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যুগান্তরের কয়েক মাসব্যাপী অনুসন্ধানে। সিসিটিভি ফুটেজ ও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, টাকার বিনিময়ে আদালতের হাজতখানা থেকে শুরু করে প্রসিকিউশন বিভাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই চক্রের বিষাক্ত জাল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে আসামিদের নামে ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে। পরিকল্পিতভাবে নিজেদের সুবিধামতো তারিখ বসিয়ে ওই ভুয়া ওয়ারেন্ট কারাগারে পাঠায়। পরে কারাগারে থাকা চক্রের সহযোগীরা সেটিকে ওয়ারেন্ট তালিকায় এন্ট্রি করে। ফলে নথি অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু আদালত কক্ষে হাজির করার পরিবর্তে চক্রের সদস্যরা তাকে আদালত ভবনের অন্যত্র নিয়ে যায়। এরপর সুবিধামতো কোনো কক্ষ বা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসামিকে নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক, খাওয়াদাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা-এমনকি গোপনে বৈঠক করার সুযোগও দেওয়া হয়।
এ ধরনের ঘটনার তথ্যপ্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ যুগান্তরের হাতে এসেছে। এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আসামিকে আদালতে হাজিরার কথা বলে হাজতখানা থেকে বের করে আদালত ভবনের ১০ তলার রেকর্ড রুমে নিয়ে ওইসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একই আসামিকে টানা চারদিন একই কৌশলে আদালতে এনে একই কক্ষে নেওয়া হয়েছে। অথচ ওই চার দিনের কোনোদিনই আসামির আদালতে হাজিরার নির্ধারিত তারিখ ছিল না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভুয়া ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই তাকে কারাগার থেকে বের করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে চক্রটি আসামি বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে। মামলার ধরন, আসামির প্রভাব ও সুবিধার মাত্রা অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
কেস স্টাডি ১ : রাজধানীর গুলশান, পল্টন, উত্তরা পূর্ব ও মুগদা থানার চার মামলার আসামি রুবেল আহম্মেদ। ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানা থেকে তাকে আদালতের দশ তলায় রেকর্ড রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে তার হাতকড়া খুলে দেওয়া, চলাফেরা, মোবাইল ফোন ব্যবহার, আইনজীবী ও আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং খাবারের সুবিধা দেওয়া হয়। এ সুযোগে আসামি গোপনে বৈঠকও করে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১ অক্টোবর আদালতে আসামির হাজিরার তারিখ না থাকলেও তাকে রেকর্ড রুমে নিয়ে ওইসব সুবিধা দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২২ অক্টোবর। সেইদিন আসামি রেকর্ড রুম থেকে কৌশলে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে। এরপর বিচারকদের লিফট ব্যবহার করে পালিয়ে যায়।
জানা যায়, এসব ঘটনায় কনস্টেবল মো. মাহফিজুল ইসলাম, হাজতখানার ইনচার্জ এসআই জাহিদুল ইসলাম, এএসআই মাজহারুল ইসলাম, কনস্টেবল তহিদুল ইসলাম, বেলাল উদ্দিন, মাহাবুব রহমান, সিএমএম কোর্টের রেকর্ড কিপার আব্দুর রহমান আজাদ ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নায়েক কামরুল এর সঙ্গে জড়িত।
কেস স্টাডি ২ : চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা ওয়াসিমের নামে হঠাৎ করেই একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা যায় স্থানীয় থানায়। পরোয়ানায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার কলাবাগান থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি আসামি। বিষয়টি জানতে পেরে ওয়াসিম ঢাকায় এসে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে খোঁজ নেন আদৌ তার বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা আছে কি না। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে জারি হওয়া পরোয়ানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া। শুধু ওয়াসিমই নন, যুগান্তরের হাতে এমন আরও ৮টি জাল পরোয়ানার কপি এসছে। সবই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব পরোয়ানা ডাকযোগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালী থানায় পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট থানা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পায়, পরোয়ানাগুলো পুলিশের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ সিডিএমএস-এ অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে সেগুলো ডিএমপি বরাবর ফেরত পাঠানো হয় সিডিএমএস-এ এন্ট্রির জন্য। পরে ডিএমপি থেকে পরোয়ানাগুলো আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে পাঠানো হলে সেখানে যথাযথ যাচাই ছাড়াই সেগুলো সিডিএমএস-এ এন্ট্রি করা হয়। এর ফলে জাল পরোয়ানাগুলো সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে আবার সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়।
এরপরই ওয়াসিম জানতে পারেন, ঢাকার একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবে ঢাকায় এসে জানতে পারেন এই পরোয়ানা ভুয়া। যুগান্তর এসব মামলার কপি যাচাই করে দেখে, মামলার এজাহারে তাদের কারও নাম নেই।
জানা যায়, চক্রটি হুবহু আদালতের আসল পরোয়ানার আদলে জাল গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে পাঠিয়ে দেয়। ভুয়া ওয়ারেন্টগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেগুলো দেখতে প্রায় অবিকল আসল পরোয়ানার মতো। পরোয়ানায় সংশ্লিষ্ট আদালতের ফরম্যাট, মামলার তথ্য এবং বিচারকের স্বাক্ষরও রয়েছে।
সূত্র জানায়, এত নিখুঁতভাবে আদালতের ফরম্যাট ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করা সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যারা আদালতের নথিপত্র, পরোয়ানা ইস্যুর পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি জানেন, তারাই এমন জাল নথি তৈরি করতে পারেন। এ চক্রের সঙ্গে আদালতের কিছু অসাধু পেশকার, উমেদার এবং পুলিশের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। তাদের যোগসাজশেই এসব জাল পরোয়ানা তৈরি এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে। তিনি বলেন, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ, তাই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি, যাতে অন্যরা সতর্ক হয় এবং এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকে। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। যদি এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, সে ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখব। তদন্তে কারও দায়দায়িত্ব প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিএমএম কোর্টের হাজতখানায় ফের ঘুস বাণিজ্য : ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় ফের শুরু হয়েছে ঘুস বাণিজ্য। বিষয়টি নিয়ে এর আগে ‘ঘুসের ওপেন সিক্রেট’ শিরোনামে যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর কিছুদিন গারদখানায় অবৈধ সুবিধা দেওয়া বন্ধ থাকলেও আবারও আগের মতো অনিয়ম শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে সেখানে থাকা আসামিদের অবৈধভাবে খাবার দেওয়া, দেখা করিয়ে দেওয়া, ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় এই অনিয়ম চলছে।
এছাড়াও নিু আদালতে জামিন না হলে বিচারপ্রার্থীরা সিনিয়র আদালতে জামিনের আবেদন করেন, যাকে বলা হয় সিআরমিস (ক্রিমিনাল মিস কেস)। এসব সিআরমিস মামলার শুনানির মাধমে জামিন বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন প্রসিকিউশনের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, প্রসিকিউশনের ওসি আসাদুজ্জামান ও একে সাইদুল হক ভুঁইয়া অর্থের বিনিময়ে সিআরমিস শুনানিতে আসামিদের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আসছেন। এর মধ্যে রয়েছে জামিন বাণিজ্য, রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে আদালতে কথা না বলা, আসামির জামিনের বিরোধিতা না করার মতো বিষয়।
জানা যায়, ৫ আগস্টের আগে থেকে প্রসিকিউশন বিভাগে দায়িত্বে রয়েছেন তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি ভোল পালটান এ দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

