Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্তদের হামে সংক্রমণ বেশি

তিন মাসে অর্ধশত শিশু মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে

Advertisement

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্তদের হামে সংক্রমণ বেশি

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে মঙ্গলবার হাম আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসক -যুগান্তর

Advertisement

ভাইরাসজনিত রোগ হামের প্রাদুর্ভাব দিনদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যেসব শিশু নিউমোনিয়া, চিকেনপক্স, ডায়রিয়া বা জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে, যাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং কোমরবিডিটি বা দীর্ঘমেয়াদে রোগাক্রান্ত, তাদের জন্য এই সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে টিকা না পাওয়া ৩ থেকে ১০ মাস বয়সি শিশুদের অবস্থা বেশি শোচনীয়। রোগীর চাপে অনেক হাসপাতালের শয্যা ছাড়িয়ে বারান্দা-মেঝেতে ঠাঁই হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের। অন্যদিকে একই ওয়ার্ডে বিভিন্ন সংক্রামক রোগীর একত্রে অবস্থান চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। গত তিন মাসে হামে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম খুবই সংক্রামক। হামে একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৬-১৮ জন আক্রান্ত হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের হাম বেশি হয়। তবে তার চেয়ে বেশি বয়সিরাও হামে আক্রান্ত হতে পারে। হামে আক্রান্ত হলে শরীর দুর্বল হয়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়।

মঙ্গলবার দুপুর ২টা। রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটটের নিচতলার বিশেষায়িত হামওয়ার্ডের ১৮টি বিছানার সবগুলো রোগীতে পূর্ণ। হাম আক্রান্ত হয়ে ওয়ার্ডের এম-পি ১ নম্বর শয্যায় নানির কোলে নেতিয়ে শুয়েছিল এক বছর বয়সি শিশু সামিউল ইসলাম।

হাম আক্রান্ত শিশুটির তীব্র শ্বাসকষ্ট লাঘবে নাকের সঙ্গে লাগানো নল দিয়ে অক্সিজেন চলছিল। বাম হাতে পরানো ক্যানুলার মাধ্যমে চলছিল স্যালাইন। তারপরও তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কাশির কারণে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল শিশুটির। প্রায় ১০ দিন ধরে হামের সঙ্গে লড়াইয়ের ধকল সইতে না পেরে অপুষ্ট ও দুর্বল শরীরে থমকে থমকে ক্ষীণকণ্ঠে কান্না করে উঠছিল সে। এমন যন্ত্রণা দেখে নানি মমতাজ বেগম অশ্রুসজল চোখে নাতির সুস্থতার জন্য অনবরত আল্লাহকে ডাকছিলেন।

জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, সামিউলের জন্মগতভাবে হার্টে ছিদ্র রয়েছে। টিকা নিলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় চিকিৎসকরা টিকা দিতে নিষেধ করেছেন। ফলে ইপিআই কর্মসূচির একটি টিকাও দেওয়া হয়নি। নাতি কমবেশি অসুস্থ থাকে। দিন-দশেক আগে হঠাৎ ঠান্ডা জ্বর ও কাশি শুরু হলে প্রথমে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে নিই। সেখানে দুদিন ভর্তি থাকি।

পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা এখানে (শিশু হাসপাতাল) পাঠিয়েছে। এখানকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জন্মগত হার্টের ছিদ্র ও অন্যান্য রোগব্যাধির কারণে শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম। হামের সঙ্গে জ্বর-কাশি ও নিউমোনিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এখানে আনার পর জ্বর কিছুটা কমলেও হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট কমছে না। দীর্ঘমেয়াদি রোগব্যাধি থাকায় সুস্থ হতে সময় লাগছে।

শিশু হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক-নার্স যুগান্তরকে জানান, হামের রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত এই ওয়ার্ডে ১৮টি শয্যার সবগুলোই রোগী ভর্তি। ওয়ার্ডটিতে পিআইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা) সেবা দেওয়া হচ্ছে। এজন্য একটি ভেন্টিলেটর মেশিন, একটি হাই-ফ্লো মেশিন ও একটি সিপ্যাপ মেশিন রাখা হয়েছে।

রোগীর চাপ থাকায় পাশের দুই নম্বর ওয়ার্ডে ২৬ শয্যার আরেকটি ইউনিট খোলা হয়েছে। ওয়ার্ড দুটিতে হামের রোগীদের মধ্যে যারা কোমরবিডিটি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত তাদের শারীরিক পরিস্থিতির বেশি অবনতি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, হাম নিয়ে শিশু হাসপাতালে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৮ জন ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু মার্চের প্রথম ২৬ দিনে ভর্তি হয়েছে ১১৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয় ২২ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৫২ জন। হামজনিত জটিলতায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় (ইপিআই) প্রত্যেক শিশুকে ৯ মাস বয়সে হাম প্রতিরোধী প্রথম ডোজ ও ১৫ মাসে দ্বিতীয় বা বুস্টার ডোজ টিকা দেওয়া হয়। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এবার হাম নিয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬ মাসের কম বয়সি শিশু ভর্তি হয়েছে ৩৫ জন।

এছাড়া ৬ থেকে ৯ মাস বয়সি ৪৪ জন, ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সি ২৯ জন, দুই বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সি ১১ জন এবং পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে ৫ জন ভর্তি হয়েছে। যাদের কোমরবিডিটি বা সহ-রোগ রয়েছে তাদের শারীরিক পরিস্থিতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গুরুতর অসুস্থরা মারা যাচ্ছে।

এদিকে রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ) ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে হামের রোগী সবচেয়ে বেশি ভর্তি হচ্ছে। গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এর নেপথ্যে শুধু হাম নয়, ঘাতক হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ পূর্বে থাকা বিভিন্ন জটিল রোগ।

সরেজমিন সংক্রামকব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হামের রোগীর প্রচণ্ড চাপে সাততলাবিশিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রটির সবগুলো ওয়ার্ডের শয্যাপূর্ণ। আইসিইউ ও এইচডিইউ ইউনিটের ১২টি শয্যা এমনকি এইচআইভি এইডসসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের রাখা হয়েছে।

ফলে একে অন্যের মাধ্যমে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, হামের রোগীদের জন্য মাত্র আটটি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল ৮টা পর্যন্ত ৭২ জন ভর্তি ছিল। সারাদিনে আরও ২৩ জন ভর্তি হয়। গত জানুয়ারি মাসে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ জনে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছে ৪৭৮ জন। জানুয়ারিতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২২ জন মারা গেছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রীবাস পাল মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, দেখা গেছে ৯০ ভাগহামের রোগীর নিউমোনিয়া, ৬০ থেকে ৭০ ভাগের ডায়রিয়া, ৫০ ভাগের কনজাংক্টিভাইটিস (চোখ লাল) হওয়া ইত্যাদি। তবে শুধু হাম আক্রান্ত হয়ে কেউই মারা যায়নি। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বেশি মারা গেছে।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হাম হলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। হাম শিশুদের বেশি হয়। যেসব শিশু জন্মের পর মায়ের শালদুধ খায়নি, তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তারা হামে আক্রান্ত হলে সেকেন্ডারি ইনফেকশন বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বেশি আক্রান্ত হতে পারে। সঙ্গে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য রোগ থাকলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, জন্মের প্রথম ৯ মাস মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে বেশ কাজ করে। ফলে ৯ মাসের পর হামের টিকা দেওয়া হয়। তাতে শিশুর শরীরে নতুন করে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কিন্তু অনেকে টিকা নেয় না। এই শিশুদের হাম হলে ঝুঁকি বাড়ে। হাম হলে যথাযথ চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে। যদি রোগীর নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম